প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের নিয়ন্ত্রণে নয়। কিন্তু দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের সিদ্ধান্ত, প্রস্তুতি এবং সংকট ব্যবস্থাপনা অবশ্যই আমাদের নিয়ন্ত্রণে। সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করার সিদ্ধান্তকে মানবিক ও বাস্তবসম্মত বলেই বিবেচনা করতে হবে। কারণ কোনো পরীক্ষাই শিক্ষার্থীর জীবন ও নিরাপত্তার চেয়ে বড় হতে পারে না।
কিন্তু পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এরপর কী? শুধু নতুন পরীক্ষার তারিখ ঘোষণাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এমন একটি পরিকল্পনা, যা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের পরবর্তী ধাপকেও সমান গুরুত্ব দেবে। অনিশ্চয়তার অবসান, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং সুসমন্বিত সময়সূচিই এখন সবচেয়ে বড় চাহিদা।
গত কয়েক দিনে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক এবং সচেতন নাগরিকদের আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে—দীর্ঘ অনিশ্চয়তা শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের গুজব, ভুয়া রুটিন এবং অনুমাননির্ভর তথ্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি হলো শিক্ষা বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত, নির্ভরযোগ্য এবং স্বচ্ছ তথ্য প্রদান।
এইচএসসি শেষেই শুরু হয় আরেকটি কঠিন পরীক্ষা
আমাদের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। এইচএসসি শেষ হওয়া মানেই একজন শিক্ষার্থীর দায়িত্ব শেষ নয়; বরং তখনই শুরু হয় উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সবচেয়ে কঠিন প্রতিযোগিতা। মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গুচ্ছ ভর্তি এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা—সবই অপেক্ষা করে থাকে এইচএসসি-পরবর্তী সময়ের জন্য।
এই পরীক্ষাগুলোর প্রস্তুতি বোর্ড পরীক্ষার প্রস্তুতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে শুধু পাঠ্যবই পড়াই যথেষ্ট নয়; দরকার ধারাবাহিক পুনরাবৃত্তি, সমস্যা সমাধানের অনুশীলন, সময় ব্যবস্থাপনা এবং মানসিক প্রস্তুতি। তাই যদি স্থগিত হওয়া পরীক্ষাগুলো খুব অল্প ব্যবধানে সম্পন্ন করা হয়, তাহলে বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড থেকে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী দেশের শীর্ষস্থানীয় মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সুযোগ অর্জন করে। তাই এই ব্যাচের জন্য এমন কোনো সময়সূচি নির্ধারণ করা উচিত নয়, যাতে তারা অন্য বোর্ডের শিক্ষার্থীদের তুলনায় বাস্তব অসুবিধার মুখোমুখি হয়। এটি বিশেষ সুবিধার দাবি নয়; এটি সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রশ্ন।
এখন দরকার দ্রুত, কিন্তু সমন্বিত সিদ্ধান্ত
দীর্ঘ অনিশ্চয়তা কোনো সমাধান নয়। আবার অতি দ্রুততার কারণে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়। তাই নতুন সময়সূচি প্রণয়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রথমত, অবশিষ্ট লিখিত পরীক্ষার নতুন সময়সূচি দ্রুত ঘোষণা করে পরীক্ষা গ্রহণ শুরু করতে হবে। অনিশ্চয়তা যত দীর্ঘ হবে, শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ তত বাড়বে এবং পড়াশোনার ধারাবাহিকতাও নষ্ট হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি পরীক্ষার মধ্যে যুক্তিসংগত বিরতি রাখতে হবে। কারণ বন্যাকবলিত এলাকার অনেক শিক্ষার্থী এখনও স্বাভাবিক পরিবেশে পড়াশোনায় ফিরতে পারেনি। তাদের বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
তৃতীয়ত, বিজ্ঞান বিভাগের ব্যবহারিক পরীক্ষাগুলো লিখিত পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর অযথা বিলম্ব না করে ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করতে হবে। এতে ফল প্রকাশ বিলম্বিত হবে না এবং শিক্ষার্থীরা ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য মূল্যবান সময় পাবে।
চতুর্থত, ফলাফল প্রকাশের সম্ভাব্য সময়সূচি এবং জাতীয় পর্যায়ের ভর্তি পরীক্ষাগুলোর সময় নির্ধারণে আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় থাকা উচিত। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষার্থীরা যেন আবেদন, প্রস্তুতি কিংবা পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সময়গত বৈষম্যের শিকার না হয়।
পঞ্চমত, শিক্ষা বোর্ড ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির উচিত নিয়মিত অগ্রগতি জানানো। প্রতিদিন না হলেও নির্দিষ্ট বিরতিতে আনুষ্ঠানিক আপডেট দিলে গুজব কমবে এবং শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের আস্থা বাড়বে।
এটি কেবল একটি রুটিনের বিষয় নয়
একটি পরীক্ষার সময়সূচি শুধু কয়েকটি তারিখের তালিকা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগ, মানসিক সুস্থতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের ভিত্তি। তাই নতুন সময়সূচি প্রণয়নের ক্ষেত্রে শুধু অবশিষ্ট পরীক্ষা শেষ করার বিষয়টি নয়, বরং উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সামগ্রিক বাস্তবতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা
এই ঘটনাটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই এখনই একটি জাতীয় দুর্যোগকালীন পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। সেখানে বিকল্প সময়সূচি, দ্রুত তথ্যপ্রচার, গুজব মোকাবিলা, দুর্যোগপীড়িত অঞ্চলের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা এবং ভর্তি পরীক্ষার সঙ্গে সমন্বিত পরিকল্পনার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত।
আমাদের প্রত্যাশা খুবই সহজ। দ্রুত নতুন সময়সূচি ঘোষণা করা হোক। অবশিষ্ট লিখিত পরীক্ষা শুরু হোক। বিজ্ঞান বিভাগের ব্যবহারিক পরীক্ষাগুলো দ্রুত সম্পন্ন করা হোক। ফল প্রকাশে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব না হোক। এবং সর্বোপরি, মেডিকেল, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য শিক্ষার্থীরা যেন যুক্তিসংগত সময় পায়, তা নিশ্চিত করা হোক।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষার্থীরা কোনো বিশেষ সুবিধা চাইছে না। তারা চাইছে একটি ন্যায্য সুযোগ—যে সুযোগ দেশের অন্য সব শিক্ষার্থীরও প্রাপ্য। প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাদের পছন্দ ছিল না; তাই সেই দুর্যোগের প্রভাব যেন তাদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্নকে সীমাবদ্ধ না করে।
কারণ এইচএসসি শুধু একটি পাবলিক পরীক্ষা নয়; এটি একটি প্রজন্মের ভবিষ্যতের দ্বার। সেই দ্বার খুলে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের সবার, আর সেই দায়িত্ব পালনের সর্বোত্তম উপায় হলো—দ্রুত, সমন্বিত, শিক্ষার্থীবান্ধব এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
লেখক: শিক্ষক, গবেষক ও চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।