মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেছেন যেসব দেশের রাষ্ট্রপতিরা

রাষ্ট্রপতিরা সাধারণত নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ করেই দায়িত্ব ছাড়েন। তবে রাজনৈতিক সংকট, গণআন্দোলন, দুর্নীতির অভিযোগ, অভিশংসন কিংবা সাংবিধানিক চাপের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই রাষ্ট্রপ্রধানের পদত্যাগের বহু নজির রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে শুরু করে পেরু, শ্রীলঙ্কা কিংবা জার্মানি বিভিন্ন সময়ে এমন ঘটনা বিশ্বরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।

বাংলাদেশেও রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সম্ভাব্য পদত্যাগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।

দক্ষিণ কোরিয়া: দুর্নীতির অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত
দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট পার্ক গিউন-হে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে ব্যাপক জনরোষের মুখে পড়েন। পরে দেশটির সাংবিধানিক আদালত তার অভিশংসন বহাল রাখলে তিনি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দায়িত্ব হারান। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে বিচারও অনুষ্ঠিত হয়।

পেরুর প্রেসিডেন্ট পেদ্রো পাবলো কুচিনস্কি দুর্নীতির অভিযোগ ও অভিশংসনের মুখে পদত্যাগ করেন।

পেরু: বারবার নেতৃত্ব বদলের নজির
রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য পরিচিত পেরুতে গত এক দশকে একাধিক প্রেসিডেন্ট মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। ২০১৮ সালে দুর্নীতির অভিযোগে অভিশংসনের মুখে পদত্যাগ করেন পেদ্রো পাবলো কুচিনস্কি। ২০২০ সালে কংগ্রেস অপসারণ করে প্রেসিডেন্ট মার্টিন ভিজকারাকে। একই বছর গণবিক্ষোভের মুখে মাত্র কয়েক দিনের মাথায় পদত্যাগ করেন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল মেরিনো।

শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।

শ্রীলঙ্কা: গণআন্দোলনের মুখে বিদায়
২০২২ সালে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের জেরে শ্রীলঙ্কাজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনকারীরা প্রেসিডেন্ট ভবন দখল করলে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে। পরে বিদেশে অবস্থান করেই তিনি পদত্যাগপত্র পাঠান। সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত রাষ্ট্রপতি পদত্যাগের ঘটনাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।

জার্মানির সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্রিশ্চিয়ান উলফ।

জার্মানি: বিতর্কে ইতি টানেন উলফ
জার্মানির প্রেসিডেন্ট ক্রিশ্চিয়ান উলফ ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা গ্রহণ ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। তদন্ত শুরু হওয়ার পর ২০১২ সালে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি পদত্যাগ করেন।

বলিভিয়া: রাজনৈতিক সংকটের পর পদত্যাগ
২০১৯ সালের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ ঘিরে বলিভিয়ায় ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। রাজনৈতিক চাপ ও সেনাবাহিনীর অবস্থানের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস পদত্যাগ করেন এবং পরে দেশ ত্যাগ করেন।

বাংলাদেশেও কি সেই পথে?
২০২৩ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। বর্তমান মেয়াদ অনুযায়ী ২০২৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে থাকার কথা তার। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তার সম্ভাব্য পদত্যাগ নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে আলোচনা জোরালো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সসহ একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে আলোচনা চলছে এবং তিনি শিগগিরই দায়িত্ব ছাড়তে পারেন বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো ঘোষণা বা প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। ফলে বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত নয়।

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত সংবিধানে নির্ধারিত বিধান অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, রাষ্ট্রপতির আগাম বিদায়ের পেছনে একেক দেশে একেক ধরনের কারণ কাজ করেছে। কোথাও দুর্নীতির অভিযোগ, কোথাও গণআন্দোলন, কোথাও অর্থনৈতিক সংকট কিংবা রাজনৈতিক অচলাবস্থা রাষ্ট্রপ্রধানকে পদত্যাগে বাধ্য করেছে। বাংলাদেশেও চলমান আলোচনা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়ায়, সেটি নির্ভর করবে পরবর্তী সরকারি সিদ্ধান্ত ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ওপর।