শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন

সিটি কলেজসহ তিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১০ কোটি টাকা লুটপাট, ১১১ শিক্ষক অবৈধ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একের পর এক অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে আসছে। সর্বশেষ তিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১০ কোটি টাকার বেশি লুটপাট করার প্রমাণ পেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। এরমধ্যে রাজধানীর মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজে ৫ কোটি ১০ লাখ ৭৮ হাজার টাকা, ঢাকা সিটি কলেজে ৪ কোটি টাকা ও নরসিংদীর মনোহরদীর আছাদনগর ফাজিল মাদ্রাসায় ১ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে। শুধু তাই নয়, মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ, ঢাকা সিটি কলেজের ১০৫ শিক্ষক ও আছাদনগর ফাজিল মাদ্রাসার পাঁচ শিক্ষকের নিয়োগ অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ডিআইএ।

এছাড়া প্রতিষ্ঠান তিনটিতে যোগ্যতা ছাড়াই এমপিও প্রদান, নিয়োগ বিধি লঙ্ঘন, ক্যাশবইয়ে লাখ লাখ টাকা লেনদেনের হিসাবের অনুল্লেখ, অনিয়মের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ, জাল সনদ ব্যবহার, বিধিবহির্ভূতভাবে বেতন-ভাতা গ্রহণ, সরকারি রাজস্ব জমা না দেওয়া, ব্যাংকিং বিধি না মেনে নগদ অর্থ ব্যয়, সিটি অ্যালাউন্স গ্রহণ, অতিরিক্ত ভর্তি ও অনলাইন ফি আদায়সহ অর্থ ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক অনিয়মের তথ্য পেয়েছে সংস্থাটির সরেজমিন পরিদর্শনকারী টিম। অনিয়মের অর্থ ফেরত নিয়ে সরকারি কোষাগারে জমা এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। সম্প্রতি উল্লিখিত তিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তিনটি প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে ডিআইএ। তিনটি তদন্ত প্রতিবেদনের কপি ইত্তেফাকের কাছে এসেছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) পরিচালক প্রফেসর এম এম সহিদুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা (ডিআইএ) প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তিনটা পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি। সেখান থেকে বিধি ও নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজ

কলেজটিতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত বড় অঙ্কের অর্থ আদায়ের অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে ডিআইএর তদন্ত দল। সরকারি নীতিমালায় একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি ও সেশন ফি সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা নির্ধারিত থাকলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৭ হাজার ৫০০ টাকা করে আদায় করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক (পাশ), স্নাতক (সম্মান) এবং প্রফেশনাল বিবিএসহ সব মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ৮ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এরমধ্যে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী রয়েছে ১ হাজার ৫০০ জন। প্রতি বছর প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে অতিরিক্ত নেওয়া হয়েছে। মোট আট বছর এটা চলে এসেছে। সেই হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত নেওয়া হয়েছে।

তদন্তে কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষের নিয়োগকে ‘বিধিসম্মত নয়’ বলে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে আনা একাধিক অভিযোগের সত্যতার কথা উল্লেখ করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ, অনিয়মে জড়িত অন্যদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ এবং সরকারি কোষাগারে বকেয়া রাজস্ব জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। ডিআইএ-এর চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে কলেজটিতে সরেজমিন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে। দলের নেতৃত্ব দেন ডিআইএ-এর পরিচালক প্রফেসর এম এম সহিদুল ইসলাম। তদন্ত প্রতিবেদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে কলেজটির বর্তমান অধ্যক্ষ মো. আমিনুল হকের নিয়োগ প্রক্রিয়া। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের ১৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নিয়োগ পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অর্জন করে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করলেও তার অভিজ্ঞতা সনদ যাচাইয়ে গুরুতর অসঙ্গতি ধরা পড়ে। তদন্তে দেখা যায়, ১৯৯৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৯৮ সালের ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত একই সময়ে তিনি ময়মনসিংহের ফুলপুর ডিগ্রি কলেজ এবং ঢাকার মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ অর্থাত্ দুটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন এবং উভয় প্রতিষ্ঠান থেকেই বেতন বা অন্যান্য সুবিধা গ্রহণ করেন। অথচ সরকারি চাকরির বিধি অনুযায়ী একই সময়ে দুটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকা সম্পূর্ণ বেআইনি। এছাড়া পরবর্তীকালে অন্য প্রতিষ্ঠানে যোগদানের সময় তিনি পরবর্তী কর্মস্থলের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্রও দাখিল করেননি। এসব কারণে তদন্ত দল মন্তব্য করেছে, তার আবেদন শুরুতেই বাতিলযোগ্য ছিল এবং তাকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া বিধিবহির্ভূত হয়েছে। এ বিষয়ে যথাযথ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।

১২ লাখ ৭৮ হাজার টাকার কর ফাঁকি:তদন্ত প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পরীক্ষার সম্মানী ও বিভিন্ন খাত থেকে অন্তত ১২ লাখ ৭৮ হাজার টাকার কর সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বিধিবহির্ভূতভাবে প্রায় ১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা অতিরিক্ত বেতন দেওয়ার অভিযোগও তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, কেনাকাটা ও ভ্যাট সংক্রান্ত লেনদেনেও প্রয়োজনীয় কর কর্তন না করায় আরো উল্লেখযোগ্য অঙ্কের রাজস্ব ক্ষতির তথ্য প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তদন্ত দল এসব অর্থ দ্রুত সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করেছে।

লগবই ছাড়াই মাইক্রোবাস ব্যবহার:কলেজের সম্পদ ব্যবস্থাপনাতেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্তে দেখা যায়, ২০১৮ সালে কেনা কলেজের মাইক্রোবাসটি দীর্ঘ সাত বছর কোনো লগবই ছাড়াই ব্যবহার করা হয়েছে। এই সময়ে জ্বালানি ও সার্ভিসিং বাবদ প্রায় ১৫ লাখ ৯২ হাজার টাকা ব্যয়ের হিসাব দেখানো হলেও গাড়ির ব্যবহার সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয়নি। সার্বিক বিষয়ে মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, তিনি সাত বছর ভাইস প্রিন্সিপাল থাকার পর অধ্যক্ষ হয়েছেন। তার অধ্যক্ষ হওয়ার ক্ষেত্রে কোন অনিয়ম হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদনের ব্যাপারে তিনি লিখিত জবাব দেবেন।

ঢাকা সিটি কলেজ

ডিআইএর পৃথক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা সিটি কলেজে বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ পাওয়া ১৯৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগে অনিয়ম হয়েছে। অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের মধ্যে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, প্রভাষক ও ডেমোনেস্ট্রেটর রয়েছেন। ডিআইএর অডিট কর্মকর্তা চন্দন কুমার দেব এবং সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মনিরুজ্জামানের স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে এ অনিয়মের চিত্র সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে শুধু পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও সাক্ষাত্কার গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নিয়োগ বোর্ডে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। এছাড়া নিয়োগ কমিটি গঠন এবং গভর্নিং বডির অনুমোদনের প্রয়োজনীয় নথিও প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ দেখাতে পারেনি। ফলে এসব নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ডিআইএ।

৭২ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে নগদ ব্যয়: ডিআইএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১২-১৩ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৭২ লাখ ৭৭ হাজার ২২৯ টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে নগদে ব্যয় করা হয়েছে। এছাড়া ঠিকাদারি কাজ ও বিভিন্ন ধরনের পণ্য কেনার ক্ষেত্রে উেস ভ্যাট কর্তন না করায় সরকারের ২৮ লাখ ৩২ হাজার ৬৯২ টাকা রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছে। একইসঙ্গে পাবলিক পরীক্ষার সম্মানীর বিপরীতে উেস আয়কর কর্তন না করায় আরো ২ লাখ ৯২ হাজার ৬৭ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার সুপারিশ করেছে ডিআইএ। এছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে বিধিবহির্ভূত গভর্নিং বডির সদস্যরা সিটিং অ্যালাউন্স হিসেবে ১ কোটি ৯৭ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩০ টাকা গ্রহণ করেছেন। ওই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে ট্রেজারি চালানের কপি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দাখিলের সুপারিশ করেছে ডিআইএ।

আছাদনগর ফাজিল মাদ্রাসা

নরসিংদীর আছাদনগর ফাজিল মাদ্রাসাতেও নিয়োগ ও বেতন-ভাতা নিয়ে গুরুতর অনিয়মের তথ্য পেয়েছে ডিআইএ। এছাড়া নিয়োগ বিধি লঙ্ঘন, জাল শিক্ষক নিবন্ধন সনদে চাকরি, শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ এবং সরকারি বেতন-ভাতা অবৈধভাবে গ্রহণের তথ্য উঠে এসেছে তদন্তে। প্রতিষ্ঠানটির জুনিয়র শিক্ষক শামসুন্নাহার এবং জুনিয়র মৌলভী মানসুরা আক্তারের শিক্ষক নিবন্ধন সনদ যাচাই করে এনটিআরসিএ জানিয়েছে, তাদের রোল নম্বর উত্তীর্ণদের তালিকায় নেই এবং দাখিল করা প্রত্যয়নপত্র জাল। এ কারণে শামসুন্নাহারের গ্রহণ করা ১১ লাখ ২১ হাজার ১০০ টাকা এবং মানসুরা আক্তারের ১ লাখ ৯১ হাজার ৯০০ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া সহকারী শিক্ষক মো. আবদুর রাজ্জাক, সহকারী শিক্ষক (বাংলা) আছমা বেগম ও সহকারী গ্রন্থাগারিক নেছার উদ্দীন আহমেদের নিয়োগ অবৈধ। সবমিলিয়ে সাত শিক্ষক-কর্মচারীর কাছ থেকে মোট ৮৬ লাখ ৩৩ হাজার টাকা ফেরত চাওয়া হয়েছে।

২১ হাজার ৭০৮ টাকা ভ্যাট ফাঁকি: পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আছাদনগর ফাজিল মাদ্রাসায় ব্যয়ের বিপরীতে কর্তনযোগ্য ২১ হাজার ৭০৮ টাকা ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। সম্মানি খাতে উেস কর্তনযোগ্য ৭ হাজার ১০২ টাকা আয়কর জমা দেওয়া হয়নি। বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারিত ফির চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষা ও রেজিস্ট্রেশন ফি হিসেবে আদায় করা হয়েছে। অর্থ ও ক্রয় উপকমিটি, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিটি, বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়নসহ আর্থিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ বিধানগুলোও যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। বেতন স্কেলেও বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য পেয়েছে ডিআইএ। মাদ্রাসাটির ১ দশমিক ৮২ একর জমি বেহাত হয়েছে। কীভাবে ওই জমি বেহাত হলো এবং এর পেছনে কারা দায়ী, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের কাছে জবাব চাওয়া হয়েছে। ডিআইএর প্রতিবেদনের বিষয়ে আছাদনগর ফাজিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জবিরুল ইসলামের মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

প্রসঙ্গত, গত চার মাসে রাজধানীর মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ প্রায় ২০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেছে ডিআইএ। এরমধ্যে প্রায় ১০টা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।