আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস আজ

নিরক্ষর ৩ কোটি ৬৩ লাখ মানুষ, ঠকছে পদে পদে

প্রাথমিকে ঝরে পড়েছে ১৬ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী, নিরক্ষরমুক্ত হতে বড় বাধা দারিদ্র্য

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:২৯

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর এখনো দেশের ৩ কোটি ৬৩ লাখ মানুষ নিরক্ষর। তারা পদে পদে ঠকছেন। শুধু অক্ষরজ্ঞান না থাকায় অনেক পেশাজীবী আজও ঘুষ ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-এর তথ্যানুযায়ী, দেশের সাত বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। সেই হিসাবে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ২২ দশমিক ১ ভাগ মানুষ এখনো নিরক্ষর। সমীক্ষার তথ্যে উঠে এসেছে, ‘দেশের মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি ২২ লক্ষ ৮০ হাজার।’

আজ মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা (ইউনেসকো) নির্ধারিত এ বছর সাক্ষরতা দিবসের প্রতিপাদ্য ‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’। দিবসটি উপলক্ষ্যে গতকাল সোমবার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘বাংলাদেশে সাক্ষরতা বিস্তারে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫ এর তথ্য অনুযায়ী দেশে সাক্ষরতার হার ৭৭.৯ শতাংশ। এই অগ্রগতি আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক। দেশে ২০৩১ সালের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার।’ এদিকে স্বাধীনতার পর থেকে দেশে সাক্ষরতার হার বেড়েছে। তবে শতভাগ সাক্ষরতা নিশ্চিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দারিদ্র্য। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশের দারিদ্র্যের হার যত কমেছে সাক্ষরতার হার তত বেড়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার ছিল ৮০ শতাংশের বেশি আর সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে দারিদ্র্যের সেই হার নেমে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে। গত ৫৫ বছরে দারিদ্র্যের হার কমেছে ৫৮ শতাংশ। অন্যদিকে এই সময়ে সাক্ষরতার হার বেড়েছে ৬১ দশমিক ১ শতাংশ।

অক্ষরজ্ঞানশূন্য মানুষ কর্মস্থলে বেতন কম পাচ্ছে: এদিকে সাক্ষরতার অভাবে পদে পদে ঠকছে মানুষ। সম্প্রতি ঢাকার বিআরটিএ অফিসে ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষার জন্য যান আজিজুল হক। তার বাড়ি সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জে। তিনি জানান, অনেক বছর ট্রাক চালান। সব পার্টসের ফাংশন বোঝেন। কিন্তু লেখাপড়া জানেন না। এ কারণে ড্রাইভিংয়ের লিখিত পরীক্ষায় পাশ করতে পারেন না। এবার ১৪ হাজার টাকার বিনিময়ে দালাল ধরেছেন। শুধু আজিজুল হক নন, প্রতি বছর অক্ষরজ্ঞানশূন্য মানুষ শ্রমিক হিসেবে দেশের বাইরে পাড়ি জমাচ্ছেন। এসব শ্রমিককে হাতে-কলমে প্রশিক্ষিত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও অক্ষর চিনতে না পারায় হয়রানিসহ বেতন কম পাচ্ছেন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী স্বীকার করেন, ‘এখনো একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা ও দক্ষতার সুযোগের বাইরে রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে বিদ্যালয় বহির্ভূত ও ঝরে পড়া শিশু-কিশোর, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং শিক্ষা থেকে বঞ্চিত প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষ। তাদের কাছে শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দেওয়া রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এবং উন্নয়ন অগ্রযাত্রার অন্যতম প্রধান শর্ত।’ একাধিক পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাক্ষরতার হার নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি তথ্যে বড় ধরনের ফারাক রয়েছে। সাক্ষরতার আন্তর্জাতিক সংজ্ঞার সঙ্গেও আমাদের কার্যক্রমের মিল নেই। এ কারণে দেশকে নিরক্ষরমুক্ত করার পরিকল্পনা দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

সাক্ষরতার আলোয় শান্তিপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান রাষ্ট্রপতির: আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষ্যে দেশবাসীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, সাক্ষরতা শুধু পড়া, লেখা ও গণনার দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; জীবন দক্ষতা, তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, বিশ্লেষণমূলক চিন্তা, নৈতিক মূল্যবোধ, পরিবেশ সচেতনতা ও সমাজের সমৃদ্ধিও এর অন্তর্ভুক্ত। গতকাল দিবসটি উপলক্ষ্যে এক বাণীতে রাষ্ট্রপতি এ কথা বলেন।

সাক্ষরতা শুধু পড়া-লেখা নয়, দক্ষতা ও আত্মনির্ভরতার ভিত্তি: প্রধানমন্ত্রী: আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষ্যে বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় সাক্ষরতার অর্থ এখন আর শুধু পড়া, লেখা ও গণনার মৌলিক সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে ডিজিটাল দক্ষতা, তথ্য ব্যবহারের সক্ষমতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা, জীবনদক্ষতা, পরিবেশ-সচেতনতা এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও যুক্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের উন্নয়ন, পৃথিবীর সুরক্ষা এবং সমৃদ্ধ অর্থনীতির সংযোগস্থলেই আজকের সাক্ষরতার অবস্থান। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে শিক্ষানীতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে সনদনির্ভর শিক্ষা থেকে দক্ষতাভিত্তিক, কর্মমুখী ও নৈতিক শিক্ষায় উত্তরণ।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, বর্তমানে দেশের ৬৪ জেলার সদর উপজেলায় ‘কার্যকর সাক্ষরতা ও ব্যবহারিক কর্মদক্ষতা প্রশিক্ষণ (প্রাক-বৃত্তিমূলক পর্যায়)’ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে প্রতি জেলায় ৮০ জন করে মোট ৫ হাজার ১২০ জন ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়া কিশোর-কিশোরীকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। প্রতিটি কোর্সে ৪৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ১০০ ঘণ্টা কার্যকর সাক্ষরতা এবং ৩৬০ ঘণ্টা দক্ষতা প্রশিক্ষণ রয়েছে। প্রশিক্ষণটি বাংলাদেশ জাতীয় যোগ্যতা কাঠামোর (বিএনকিউএফ) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালিত হচ্ছে। তিনি বলেন, এই কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো শিক্ষা থেকে কর্মে উত্তরণের সুযোগ সৃষ্টি করা। ইতিমধ্যে বিশেষ কার্যক্রমের আওতায় নিবন্ধিত ৪ হাজার ৩১২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪ হাজার ১৯৮ জন সক্ষম হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩ হাজার ৮৮২ জন, অর্থাত্ ৯২ দশমিক ৪৭ শতাংশ সক্ষম শিক্ষার্থী কোনো না কোনো ধরনের কর্মসংস্থানের সংযোগ পেয়েছেন।

ইত্তেফাক/এনএন