চয়ন

‘আত্মানুসন্ধানই হলো লেখকের প্রধান কর্তব্য’

 

একজন পথচারী দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার পর কখনো পেছনে কখনো আশেপাশে তাকায়। ভাবে, পথের কোনো বাঁকে সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিল, বিশ্রাম নিয়েছিল কোনো সরাইখানায়, হোঁচট খেয়েছিল কখন কোন খানাখন্দে? পথ হারানোর ব্যাপারটিকেও সে ভুলতে পারে না। কপালকুণ্ডলা নবকুমারকে প্রশ্ন করেছিল, ‘পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছ?’ সেটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটি উপন্যাসের ঘটনা। আমরা যারা নবকুমার নই, অথচ মাঝে-মধ্যে পথ হারিয়ে ফেলি, তারা সচরাচর কপালকুণ্ডলার মতো কারো দেখা পাই না যে পথভ্রষ্ট আমাদের তেমন কোনো প্রশ্ন করবে। তা না থাক; সেজন্যে আফসোস করে কোনো ফায়দা নেই। তবে আমাদের মধ্যে এমন একটা বোধ আছে যা কালেভদ্রে জিজ্ঞেস করে, ‘পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছ?’ সেই বোধ আমাদের পথ বাতলে দেয় না বটে, তবে হুঁশিয়ার করে দেয়। পথ হারিয়ে ফেললে নিজেকেই খুঁজে নিতে হয় পথ। আত্মজীবনী লিখব, এমন কোনো বাসনা কখনো মনে লালন করিনি। কারণ আমার জীবন এমন কিছু অসাধারণ বর্ণাঢ্য কিংবা রোমাঞ্চকর নয় যা সাতকাহন কথা বলে পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে হবে। কয়েক বছর ধরে কয়েকজনের কাছ থেকে তাগিদ আসছে, ‘আত্মজীবনী লিখুন।’ তাগিদ যাঁরা দিচ্ছেন তাঁদের অধিকাংশই তরুণ। আমি সত্তর পেরিয়েছি, অর্থাত্ আমার জীবনের শেষ পর্ব শুরু হয়েছে। বৈদিক যুগে তো এই বয়সে লোক বানপ্রস্থ অবলম্বন করত। সংসারের মায়া ত্যাগ করে বনবাস। ফলমূল খেয়ে জীবনের বাকি দিনগুলো কোনোমতে কাটিয়ে দেওয়া এই আরকি। শোনা যায়, কেউ কেউ গাছের ডাল থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় অথবা নিজের নাভিমূলের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে কাটিয়ে দিতেন বছরের পর বছর। এখনও দেন কোনো কোনো সন্ন্যাসী। এই কৃচ্ছ্র সাধনা দরবেশদের মধ্যেও লক্ষ করা যায়। তবে আমি কস্মিনকালেও সন্ন্যাসী কিংবা দরবেশ হওয়ার কথা ভাবিনি। সেই যে রবীন্দ্রনাথ লিখে গেছেন, ‘বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি সে আমার নয়’, এতে আমি পুরোপুরি বিশ্বাসী। রবীন্দ্রনাথ আমাদের অনেকেরই মনের কথা প্রকাশ করেছেন এই পঙিক্ততে।

...এক অর্থে সকল মানুষই একা। অনেকে একাকিত্ব উপলব্ধি করতে অক্ষম, কারো কারো মর্মমূলে তীরের মতো বিঁধে থাকে নৈঃসঙ্গ্যবোধ। তবু আমরা কোনো-না-কোনো সূত্রে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। কখনো সেই সম্পর্ক গভীর, কখনো বা উপরিতলে ছুঁয়ে-যাওয়া। আমি নিঃসঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও অনেকের সঙ্গে জড়িয়ে আমার জীবন। তাদের বাদ দিলে আমার জীবনের বেশ কিছু অংশ আড়ালে থেকে যাবে। আমি যা লিখব তাতে শতচেষ্টাতেও আমার জীবনের সবটুকু বলা হবে না, কিছু না কিছু বাদ থেকে যাবে, অনেক চিত্রই থাকবে অপূর্ণ। আমি নিজেকে অনর্থক বড়ো কিংবা খাটো করে দেখব না; নিজের চোখে আমি যে-রকম সেভাবেই তুলে ধরব নিজেকে। যাঁদের সংস্পর্শে এসে আমি নানা ধরনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি, উপকৃত হয়েছি, তাঁদের চিত্রায়ণের বেলাতেও কোনো পক্ষপাতী দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করব না। খসে যাক সেই জিহ্বা যা মিথ্যা উদিগরণ করে। তবে আমার চোখের ও মনের দেখাটাই যে ষোলোআনা ঠিক, এ কথাই বা বলি কী করে? ভুলচুল তো মানুষেরই হয়। জীবনস্মৃতি উপন্যাস নয়। তাই, এখানে কল্পকাহিনির অবকাশ নেই। যদিও কেউ কেউ ফেনিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচুর মিথ্যার মিশেল দিয়ে আত্মকথা প্রকাশ করেন। সেটি উপন্যাস হিসাবে আকর্ষণীয় হতে পারে, কিন্তু আত্মজীবনীর দাবিদার হতে পারে না। এ কথা আমি সবসময় মনে রেখেছি। জীবনের যেখানে কিছু রঙ লেগেছে শুধু তাই বর্ণনা করেছি, অতিরিক্ত রঙ চাপানো থেকে বিরত থেকেছি। বড় মাপের লেখকদের কাছ থেকে শিখেছি, সত্য প্রকাশ এবং আত্মানুসন্ধানই হলো লেখকের প্রধান কর্তব্য।

কবির ‘কালের ধুলোয় লেখা’ (অন্যপ্রকাশ, ২০০৪) বইয়ের ‘পূর্বলেখ’ থেকে