চুরি যখন রেলপথের নিরাপত্তা চুরি করে

রেললাইনের একটি ফিশপ্লেট চুরি হইলে খবর হয় না; কিন্তু সেই ফিশপ্লেটের অনুপস্থিতিতে যদি একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়, তখন আমরা বিস্মিত হই। বিস্ময়ের কোনো কারণ নাই। দুর্ঘটনা হঠাৎ জন্মায় না-তাহার জন্ম হয় অদৃশ্য অবহেলা, ক্ষুদ্র অপরাধ এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক শৈথিল্যের ভিতর দিয়া। গতকাল দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা গেল, পদ্মা রেলপথসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রেলওয়ের ক্লিপ, ফিশপ্লেট, নাট-বল্টু, সিগন্যাল কেবল, তামার তার এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ নিয়মিত চুরি হইতেছে। 

প্রতিবেদন বলিতেছে, প্রায় ৩৮ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু রেলসংযোগ প্রকল্প হইতে ইতিমধ্যে প্রায় ৯৩ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ চুরি হইয়াছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানও এই চুরি ও নাশকতার বিষয়ে লিখিতভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করিয়াছে। আরও উদ্বেগের বিষয়, সিগন্যাল সরঞ্জাম ও কেবল চুরির ফলে বহু স্থানে আধুনিক কম্পিউটার-ভিত্তিক সিগন্যাল ব্যবস্থা অকার্যকর হইয়া পড়িয়াছে। বাধ্য হইয়া ট্রেন পরিচালনা করিতে হইতেছে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে। অর্থাৎ, হাজার হাজার কোটি টাকার প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো শেষ পর্যন্ত নির্ভর করিতেছে মানুষের হাতে ধরা একটি ‘লুক স্টিক’-এর উপর। উন্নয়নের ভাষায় ইহা নিছক প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা নহে-ইহা রক্ষণাবেক্ষণের সামগ্রিক ব্যর্থতা। শিবচর স্টেশনের কর্মকর্তারা যাহা বলিয়াছেন, তাহা আরও উদ্বেগজনক। যন্ত্রাংশ চুরি হইলে ব্লক-ব্যবস্থা অচল হইয়া পড়ে, ট্রেন বিলম্বিত হয়, দুর্ঘটনার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়, আর কর্মচারীদের রেললাইনের পাশে দাঁড়াইয়া জীবনবাজি রাখিয়া দায়িত্ব পালন করিতে হয়।

রেল কর্তৃপক্ষ জনবলসংকটের কথা বলিয়াছেন। নূতন স্টেশন নির্মিত হইয়াছে; কিন্তু পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করা যায় নাই। বহু স্টেশন দিনের অধিকাংশ সময় কার্যত অরক্ষিত; কিন্তু সমস্যার ব্যাখ্যা এইখানেই শেষ হয় না। প্রশ্ন হইল, অবকাঠামো নির্মাণের সময় নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি কি প্রকল্প পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল? যদি না থাকে, তাহা হইলে পরিকল্পনাতেই ঘাটতি ছিল। আর যদি থাকে, তাহা হইলে বাস্তবায়নে কোথায় ব্যর্থতা ঘটিল? আরও একটি প্রশ্ন এড়াইয়া যাওয়া যায় না। এই বিপুল পরিমাণ চোরাই যন্ত্রাংশ কোথায় যায়? ফিশপ্লেট, কপার কেবল বা সিগন্যাল সরঞ্জাম বাতাসে মিলাইয়া যায় না। নিশ্চয়ই ইহার ক্রেতা আছে, ভাঙারি বাজার আছে, একটি সংগঠিত চক্র আছে। চোর ধরা প্রয়োজন; কিন্তু চোরাই মাল ক্রয়কারীকে আইনের আওতায় না আনিলে চুরি কখনো বন্ধ হইবে না। যেই বাজার চুরিকে লাভজনক করিয়া তোলে, প্রকৃত অপরাধের কেন্দ্র সেইখানেই। রেল কর্তৃপক্ষ গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি, গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের চারিদিকে লোহার সুরক্ষাবেষ্টনী নির্মাণ এবং কিছু নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত লইয়াছেন। ইহা ইতিবাচক; কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় ইহার সহিত প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিও যুক্ত করা প্রয়োজন। ঝুঁকিপূর্ণ করিডরে সার্বক্ষণিক সিসিটিভি, সেন্সরভিত্তিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, ড্রোন পর্যবেক্ষণ, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর জনবল বৃদ্ধি এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত টহল নিশ্চিত করা আবশ্যক। ইহার পাশাপাশি স্ক্র্যাপ বা ভাঙারি ব্যবসাকে নিবন্ধনের আওতায় আনিয়া সন্দেহজনক ধাতু কেনাবেচার উপর কঠোর নজরদারি প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে।

তবে আইন ও প্রযুক্তিরও একটি সীমা আছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদকে যদি মানুষ নিজের সম্পদ বলিয়া না মানে, তাহা হইলে কোনো প্রহরীই যথেষ্ট নহে। রেললাইনের পাশের গ্রামের মানুষ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিদ্যালয়, সামাজিক সংগঠন-সকলকে এই নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ করিতে হইবে। সভ্য সমাজের পরিচয় কেবল বৃহৎ সেতু নির্মাণে নয়, সেই সেতু ও রেললাইন রক্ষা করিবার সক্ষমতায়। একটি নাট-বল্টু আকারে ক্ষুদ্র হইতে পারে; কিন্তু অনেক সময় রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং নাগরিক নৈতিকতার প্রকৃত পরিমাপ লুকাইয়া থাকে সেই ক্ষুদ্র বস্তুটির মধ্যেই। রেললাইনের চুরি তাই বিচ্ছিন্ন অপরাধ নহে-ইহা উন্নয়ন, জননিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির এক অভিন্ন প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই লুক্কায়িত রহিয়াছে রেলপথের নিরাপত্তা, যাত্রীদের সুরক্ষা এবং টিকসই উন্নয়ন।