বরগুনার পাথরঘাটা সংলগ্ন বিষখালী-বলেশ্বর নদীতে যেতে হয় পাথরঘাটাজুড়ে ১২ কিলোমিটার ভাড়ানী খাল থেকে। আর এই ভাড়ানী খাল থেকে ওই এলাকার প্রায় ৪০ হাজার জেলে পার্শ্ববর্তী নদী ও বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকারে যায়। এ খাল থেকে যেতে প্রতিনিয়ত নৌ-পুলিশ ফাঁড়িকে ট্রলার প্রতি ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা দিতে হয় বলে অভিযোগ স্থানীয় জেলেদের।
দীর্ঘ দিন ধরে ভুক্তভোগী জেলে ও ব্যবসায়ীরা এমনটাই অভিযোগ জানিয়ে আসছিলেন। তবে এসব অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যাচ্ছিল না। সেই এলাকাতে এবার চাঁদা দাবির অভিযোগে একটি ভিডিও সামনে এসেছে।
নৌ-পুলিশ সদস্যের চাঁদাবাজি অভিযোগে ওই ভিডিও সামনে আসতেই ওই এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলেদের কাছ থেকে চাঁদাবাজির অহরহ অভিযোগ পেয়ে স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক জেলে সেজে চরদুয়ানী নৌ-পুলিশ ফাঁড়িতে যান। সেখানে এএসআই কবিরের সঙ্গে সাক্ষাতে একপর্যায়ে তিনি সাগরে মাছ ধরতে হলে চাঁদা দাবি করেন। সেই মুহূর্তে বিষয়টি গোপনে ভিডিও করা হয়। পরে এই ভিডিও হোয়াটস্ অ্যাপসহ বিভিন্ন মাধ্যমে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীসহ স্থানীয়দের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, লুঙ্গি ও শার্ট ফাঁড়িতে আয়েশি ভঙ্গিতে বসে আছেন এসএসআই কবির। এসময় তিনি পায়ের ওপর পা তুলে ছদ্মবেশী জেলের সঙ্গে আলাপচারিতার এক পর্যায়ে টাকা গুণছেন।
জেলে, ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের সর্ব দক্ষিণের জেলা বরগুনা। এই বরগুনার নদীবেষ্ঠিত উপজেলা পাথরঘাটা। যার পূর্বে বিষখালী পশ্চিম বলেশ্বর এবং দক্ষিণ এ বিশাল বঙ্গোপসাগর। এছাড়াও বলেশ্বর ও বিষখালী নদীকে সংযুক্ত করেছে পাথরঘাটার ১২ কিলোমিটার বাড়ানী খাল। প্রতিদিন এই নৌ-পথে দিয়ে চলাচল করে শত শত মাছ ধরার ট্রলার, স্টিলের ট্রলার, ছোট জাহাজসহ বিভিন্ন নৌযান। আর এই পথেই দীর্ঘদিন ধরে চরদুয়ানী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির নামে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ করছেন জেলে, কাঠ ব্যবসায়ীরা ও ট্রলার মালিকরা। এই অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষ মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত।
দীর্ঘদিন ধরে এখানকার জেলে ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এই নদী ও সমুদ্রে সঙ্গে যুদ্ধে নেমে মাছ শিকার করলেও কূলে ফিরে এসে প্রতি ট্রিপেই নৌ-পুলিশ ফাঁড়িকে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা করে দিতে হয়। তাছাড়া এ পাথরঘাটা রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র।
সব জেলেরা মাছ শিকার করে এই মৎস্য ঘাটে বিক্রির জন্য নিয়ে আসেন। এখানে বিক্রি করে নদী বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকার যেতে হলে তাদেরকে টাকা দিয়ে যেতে হয়। তাদের নির্ধারিত অংকের টাকা না দিলে মামলা-হামলাসহ এবং বৈধ কালকে অবৈধ বলে পুড়িয়ে ফেলা হয়।
আজাদ ও সোহেল নামে দুজন কাঠ ব্যবসায়ী বলেন,
আমরা প্রতি মাসে কয়েকবার এই খাল দিয়ে চলাচল করি। বিভিন্ন গ্রামগঞ্জ থেকে লাকড়ি সংগ্রহ করে খুলনা, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করতে নিয়ে যাই নদী পথ দিয়ে। বিভিন্ন সময় প্রতি ট্রিপে জাহাজ প্রতি দিতে হয় ২০০০ টাকা থেকে ৩০০০ হাজার টাকা। প্রত্যেকটি ট্রিপে আমি একা নয়, এরকম অনেক ভুক্তভোগী কাঠ ব্যবসায়ী রয়েছেন। আমরা চাই এই চাঁদাবাজি বন্ধ হোক।
জেলে জাকির হোসেন এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও অনেকে জানান, ছোট কাঠের নৌকা এবং স্টিল বডি ট্রলার থেকে মাসে দেড় হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা, মাছ ধরার ট্রলার থেকে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা এবং বড় নৌযান থেকেও নির্ধারিত অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়। টাকা না দিলে মামলা, হয়রানি কিংবা নৌযান আটকে দেওয়ার ভয় দেখানোরও অভিযোগ রয়েছে। উপজেলায় দুটি মৎস্য বন্দরের একটি মৎস্য বন্দর চরদুয়ানী বাজারে অবস্থিত। যার কারণে জেলেদের চলাচল অনেক বেশি। খালের দুই মাথায় দুই নদী এবং উপজেলার একমাত্র নদীপথে চলাচলের মাধ্যমেই খাল, এই খালের শেষ মাথায় রয়েছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত এএসআই কবিরের বক্তব্য নিতে চরদুয়ানি পুলিশ ফাঁড়িতে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে কল করে জেলেদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ‘দূরে আছি’ বলে ফোন কেটে দেন তিনি। পরে আবারও মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
চরদুয়ানী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. গজনবীর কাছে জানতে চাইলে তিনি অস্বীকার করে বলেন, এরকম কোন চাঁদা নেওয়ার আমার জানা নেই।
ভিডিওতে টাকা লেনদেনের দৃশ্য এবং একাধিক কল রেকর্ড শুনিয়ে চাঁদাবাজির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এই ঘটনা আমার জানা নেই। যদি কেউ এরকম করে থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পাথরঘাটা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা হাসিবুল হক বলেন, জেলেদের কাছ থেকে নৌ-পুলিশের টাকা নেওয়ার বিষয়টি আমরা সবসময় মুখে মুখে শুনি। তবে বিষয়টি এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে ধরা পড়েনি। আপনার থেকে যখন ভিডিও দেখেছি বিষয়টি নিয়ে আমি উপজেলা মিটিংয়ে তুলে ধরবো। যাতে করে এই অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, আমাদের জেলেদের কাছ থেকে সব সময়ই অসাধু নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির কর্মকর্তারা টাকা নিয়ে থাকেন। বিষয়টি নতুন কিছু নয়। তাদেরকে টাকা দিতে না পারলে মাছ শিকার করতে দেওয়া হয় না এবং বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়। জেলেরা এমনিতেই নিঃস্ব হয়ে গেছে। এর উপরে, মরার উপর খরার ঘা। যেখানে জেলেদের নিরাপত্তার জন্য রাখা হয়েছে নৌ-পুলিশের ফাঁড়ি, সেখানে রক্ষকই ভক্ষক। আমরা এই অসাধু নৌ-পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়।