গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন

‘তেলাপোকা’ আন্দোলনের সাফল্যে মোদি সরকারের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লার যন্তর-মন্তরে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) আন্দোলন দেশটির সাম্প্রতিক রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। মাত্র আট সপ্তাহের আন্দোলনের মধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারকে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনাকে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক তরুণদের বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এই আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্য ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত বহন করছে।

দীর্ঘদিন ধরে দিল্লির যন্তর-মন্তর রাজনৈতিক প্রতিবাদের কেন্দ্র হলেও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক একটি আন্দোলন এত অল্প সময়ে সরকারকে নীতিগত ছাড় দিতে বাধ্য করেছে—এমন ঘটনা আগে দেখা যায়নি।

আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপ যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে পড়াশোনার সময় ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ‘ককরোচ জনতা’ নামটি ব্যবহার করেন। অভিযোগ রয়েছে, বিচারপতি বেকার তরুণ ও আন্দোলনকারীদের ‘পরজীবী’ ও ‘তেলাপোকা’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। সেই মন্তব্যকেই ব্যঙ্গাত্মক প্রতীকে রূপ দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত জনপ্রিয়তা পায় আন্দোলনটি। পরে ৬ জুন যন্তর-মন্তরে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হয়।

প্রথম দিকে সীমিত পরিসরে থাকলেও অনশন কর্মসূচির পর আন্দোলনটি দ্রুত জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়। আন্দোলনের অন্যতম মুখ সোনম ওয়াংচুককে অনশনস্থল থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পর সরকার আন্দোলন দুর্বল হবে বলে ধারণা করলেও উল্টো হাজারো মানুষ যন্তর-মন্তরে সমবেত হন।

২০ জুলাই সংসদ অভিমুখে পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে যন্তর-মন্তর এলাকায় কয়েক হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পরে বিক্ষোভকারীদের ওপর লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করা হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীরা সেই দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে বিষয়টি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর মূল ইস্যু। চিকিৎসা শিক্ষায় ভর্তি পরীক্ষায় দুর্নীতি ও অনিয়ম ভারতের বিপুল সংখ্যক মধ্যবিত্ত পরিবারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে আন্দোলনটিকে সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র বা সাম্প্রদায়িক ইস্যু হিসেবে উপস্থাপন করা সরকারের জন্য সহজ হয়নি।

পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পরীক্ষা ব্যবস্থার দুর্নীতি দমনে দ্রুত বিচার আদালত গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন। তবে তাতে আন্দোলনের গতি কমেনি। শেষ পর্যন্ত সরকার শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী বছরের উত্তর প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে আন্দোলন দীর্ঘায়িত হলে বিজেপির রাজনৈতিক ক্ষতি হতে পারে—এমন আশঙ্কাও এ সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে।

তবে বামঘরানার কিছু বিশ্লেষকের মতে, ধর্মেন্দ্র প্রধানের অপসারণ ছিল প্রতীকী সাফল্য মাত্র; এতে শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তনের নিশ্চয়তা মেলেনি। প্রধানের স্থলাভিষিক্ত নতুন শিক্ষামন্ত্রী প্রহ্লাদ জোশীকেও তারা বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখছেন না। জোশী বিজেপির আদর্শিক সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর সদস্য এবং ২০২২ সালে বহুল আলোচিত বিলকিস বানো গণধর্ষণ মামলার দণ্ডপ্রাপ্তদের আগাম মুক্তির পক্ষেও প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছিলেন।

অন্যদিকে সিজেপি নেতাদের দাবি, ধর্মেন্দ্র প্রধান ছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদির নীতিরই প্রতিনিধি। তাই আন্দোলনের উদ্দেশ্য কেবল একজন মন্ত্রীর অপসারণ নয়, বরং সরকারকে জনচাপের মুখে নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করা। তবে শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের বিষয়ে আন্দোলনের পক্ষ থেকেও এখনো সুস্পষ্ট কোনো রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়নি।

পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি কেড়েছে আন্দোলনের তরুণ নেতৃত্বও। প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের বয়স ৩০ বছর। মুখপাত্র সৌরভ দাসের বয়স ২৬ বছর। বিজেপির সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেওয়া আশুতোষ রানকা এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সভাপতি নেহা বোরা—উভয়েই তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি।

বিশ্লেষকদের মতে, বয়সে তরুণ হলেও সংগঠনের কৌশল, বার্তা প্রচারের দক্ষতা এবং চাপের মধ্যেও নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা তাদের আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। অনেকেই তাদের নেতৃত্বের সঙ্গে নিউইয়র্কের তরুণ মেয়র জোহরান মামদানির তুলনা করছেন। তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত হলেও যন্তর-মন্তরের এই আন্দোলন ভারতের রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের উত্থানের ভিত্তি তৈরি করেছে এবং ভবিষ্যতে মোদি সরকারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।