মোরশেদা ইয়াসমিন পিউ
একটি জুতার কারখানায় কাজ করে ছোট্ট সাব্বির মিয়া। অভাব তাদের নিত্য সঙ্গী। কারণ সাব্বির মিয়ার বাবা মারা গেছেন সড়ক দুর্ঘটনায়। তার পরের বছর মাত্র পাঁচ বছর বয়স থেকে সাব্বির জুতার কারখানায় কাজ করে। জুতায় আঠা লাগানো, পেরেক মারা এবং কালি করা তার কাজ। সাব্বির জানায়, “খুব ইচ্ছে করে পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুল ড্রেস আর জুতা-মোজা পরে স্কুলে যাইতে। অনেকবার মাকেও কইচি, স্কুলে পড়তে যাওয়ার কথা। কিন্তু মা কইচে—‘লেহাপড়া আমগোর মতো গরিবগোর লগে না বাজান। স্কুলে গেলে কাম করবো ক্যাডা, আর কাম না করলে আমাগো প্যাডে ভাত জুটবো না, ঘরভাড়া দিবার পারুম না’। হ্যার লাইগ্যা আর পড়তে চাই না।”
সাব্বিরের মতো আরো আছে অসংখ্য শিশু। এসব শ্রমজীবী শিশুকে তাদের কারখানার মালিক ও পরিবারে অভিভাবকদের বুঝিয়ে স্কুলে লেখাপড়া শেখাতে আনছে ‘ভিলেজ এডুকেশন রিসার্চ সেন্টার (ভার্ক)’ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। তেরেদেস হোমস নেদারল্যান্ডের অর্থায়নে শ্রমজীবী শিশুদের নিয়ে কাজ করে এই সংস্থাটি। ৩১ জন শিশুকে নিয়ে ১১টি টিমে লেখাপড়া শেখাচ্ছে তারা। সাভার বাইপাইলের চারটি এলাকায় তাদের ৪০টি স্কুল আছে। প্রতিটি ইনফরমাল প্রাইমারি স্কুলে ৭০০ শিশু রয়েছে। এই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভার্কই মূলত শ্রমজীবী শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে।
শ্রমজীবী শিশুদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে তাদের সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট অভিভাকদের উদ্বুদ্ধ করে তবেই এই শিশুদের স্কুলে আসতে হয়েছে বলে জানান ভার্কের প্রকল্প সমন্বয়কারী প্রিয়তা খন্দকার। তিনি বলেন, ‘আমাদের স্কুলগুলো থেকে ঝরে পড়া অনেক শিশুশ্রমিক স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে। কেউ কেউ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে, কেউ কারিগরি প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছে।’
ভার্কের স্কুল থেকে পিইসি পাস করেছে সালমা আক্তার। পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে গৃহকর্মীর কাজ করত সে। মা অসুস্থ হয়ে পড়লে একটি চানাচুর ফ্যাক্টরিতে চাকরি শুরু করে মাসিক মাত্র ২২০০ টাকা বেতনে। মায়ের চিকিত্সার পাশাপাশি পরিবারের খরচও তাকে জোগাতে হয়। পরে চাকরির পাশাপাশি ভার্কের স্কুল থেকে পিইসি পাশ করে। সালমা এখন শিশুশ্রম ছেড়ে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। সালমার মতো এমন সাফল্যের গল্প আছে আরো অনেকের জীবনে।
ভার্ক স্কুলে পড়তে আসা শিশু মুন্না মিয়া একটি টুপি তৈরির কারখানায়, ১০ বছর বয়সী সালমান চালের দোকানে, সাকিল ভাঙ্গাড়ির দোকানে এবং রুহুল কাজ করে রেস্টুরেন্টে। এই শিশুরাই কাজের ফাঁকে পড়তে আসে এই স্কুলে। এদের অনেকে আবার প্রাইমারি পাশ করে হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছে।
শিক্ষার পাশাপাশি মাদকাসক্ত শিশু ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে কাজ করছে ভার্ক। সংস্থাটি শ্রমজীবী শিশুদের জন্য ২০টি উপানুষ্ঠানিক স্কুল গড়ে তুলেছে। শিশুশ্রমে যুক্ত এমন ৭০০ শিশু প্রতি বছর পড়ার সুযোগ পাচ্ছে স্কুলে।
ভার্ক স্কুলের শিক্ষক সৈয়দা সানজিদা বলেন, সাত বছর ধরে এখানে কাজ করছি। এ সময়ে সাতটি ব্যাজ বের হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা শুধু পড়াতে পারি, তবে এই শিশুদের টিফিন দিতে পারলে আমাদের আরো ভালো লাগতো এবং শিশুরাও উপকৃত হতো। পাশাপাশি শিশুরা লেখাপড়ায় মনোযোগীও হতো।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আবদুস সহিদ মাহমুদ বলেন, শিশুরা যাতে শিশুশ্রমের কারণে পড়ালেখা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেদিকে সরকারের খেয়াল রাখা জরুরি। স্কুলে সুন্দর শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। যাতে শিশুরা শিক্ষা থেকে ঝরে না যায়। এ ছাড়া ঝরেপড়া শিশুদের স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনে ফিরিয়ে আনতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে বলে জানান তিনি।