সকালে ঘুম থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ করা, প্লাস্টিক বোতলের পানি পান, যাতায়াতের সময় বাতাসের ধুলাবালি, দুপুরে মাছ-ভাত কিংবা বিকেলে এক কাপ চা- দৈনন্দিন জীবনের এসব অতি সাধারণ অভ্যাসের মধ্য দিয়েই আমাদের শরীরে অজান্তে প্রবেশ করছে অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিকের কণা।
মাইক্রোপ্লাস্টিক কী, কোথা থেকে আসে
সাধারণভাবে ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিকের কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। এটি মূলত দুইভাবে তৈরি হয়। কোনো নির্দিষ্ট পণ্যে ব্যবহারের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে যখন প্লাস্টিককে কণা আকারে তৈরি করা হয়, তখন তাকে বলা হয় ‘প্রাইমারি মাইক্রোপ্লাস্টিক’। অন্যদিকে পানির বোতল, প্যাকেট বা বড় কোনো প্লাস্টিক ক্ষয়ে বা ভেঙে গিয়ে যে ক্ষুদ্র কণা তৈরি হয়, তাকে ‘সেকেন্ডারি মাইক্রোপ্লাস্টিক’ বলা হয়।
মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন আর শুধু সমুদ্র বা মাটিতে সীমাবদ্ধ নেই। পানি, খাবার ও বাতাসের মাধ্যমে মানুষ নিয়মিত এর সংস্পর্শে আসছে। মানুষের রক্ত, ফুসফুস, মস্তিষ্ক এবং গর্ভফুলের (প্লাসেন্টা) মতো সংবেদনশীল অঙ্গেও এসব প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি মিলেছে।
২০২৩ সালে প্রকাশিত দক্ষিণ কোরিয়ার এক গবেষণায় বলা হয়, মানুষ মূলত খাবার, পানি, শ্বাসপ্রশ্বাস ও সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে এই প্লাস্টিক কণা গ্রহণ করে। দেশটির ২৪টি পানি শোধনাগারের প্রতি লিটার পানিতে গড়ে শূন্য দশমিক ০৫টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গিয়েছিল। এমনকি সামুদ্রিক খাবারেও এর উপস্থিতি মিলেছে।
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টুথপেস্টই একমাত্র উৎস নয়। প্রতিদিনের খাবার, পানি, বাতাস, প্রসাধনী, পোশাক ও প্লাস্টিকজাত অসংখ্য পণ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে এই অদৃশ্য দূষক।
কীভাবে শরীরে ঢুকছে?
মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে প্রধানত তিনটি পথে প্রবেশ করে—খাবারের মাধ্যমে, পানির মাধ্যমে এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে।
সামুদ্রিক মাছ, চিংড়ি, ঝিনুক, লবণ, বোতলজাত পানি, কলের পানি, চা-ব্যাগ, কিছু টুথপেস্ট ও প্রসাধনীতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে বাতাসে ভেসে থাকা সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণাও শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, গরম খাবার প্লাস্টিকের পাত্রে রাখা বা প্লাস্টিকের বোতলে দীর্ঘ সময় পানি সংরক্ষণ করলে সেখান থেকেও ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা খাবার বা পানীয়তে মিশে যেতে পারে।
কেন উদ্বেগ বাড়ছে?
কয়েক বছর আগেও মাইক্রোপ্লাস্টিককে মূলত পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে এসব কণার উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ অনেক বেড়েছে।
গবেষকরা বলছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক শুধু প্লাস্টিক নয়; এর সঙ্গে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানও শরীরে প্রবেশ করতে পারে। কিছু প্লাস্টিকে ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থ হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিভিন্ন গবেষণায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের সঙ্গে প্রদাহ, কোষের ক্ষতি, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, প্রজননস্বাস্থ্যের সমস্যা, অন্ত্রের জীবাণুর ভারসাম্যহীনতা এবং হৃদ্রোগের সম্ভাব্য সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে এখনও আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষের ক্ষেত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
শিশুদের শরীর এখনও বিকাশমান থাকায় দূষকের প্রভাব তাদের ওপর বেশি পড়ার আশঙ্কা থাকে। একইভাবে গর্ভবতী নারীর শরীরে প্রবেশ করা ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয় কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করলে এ ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। জেনে নিন মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষতি এবং তা থেকে বাঁচার ৭টি কার্যকর উপায় সম্পর্কে।
সব সময় পানি ফিল্টার করুন
টিউবওয়েলের পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকতে পারে। তাই পানি সব সময় ফিল্টার করে পার করুন। ফিল্টার মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণাগুলোকে অনেকটাই ছেঁকে ফেলে।
বাইরে থেকে কেনা প্রক্রিয়াজাত বা প্যাকেটজাত খাবার যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন। প্লাস্টিকের পাত্র থেকে খাবারে প্লাস্টিক কণা মেশার সুযোগ থাকে। বিশেষ করে গরম খাবার প্লাস্টিকের পাত্রে থাকলে তা থেকে প্লাস্টিক কণা খাবারে মিশে যায়। বাড়িতে রান্না করা খাবার খেলে সেই বিপদ এড়ানো সম্ভব।
ধাতব বা কাচের পাত্র ব্যবহার করুন
বাড়িতেও যেকোনো খাবার রাখার ক্ষেত্রে কাচ বা ধাতব পাত্র ব্যবহার করুন। এগুলো অনেক বেশি নিরাপদ। কারণ, কাচ বা ধাতব পাত্র খাবারকে দূষিত করে না। কিন্তু প্লাস্টিক কোনোভাবে গরম হলে বা ভেঙে গেলে খাবারে তা থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক খাবারে মিশতে পারে।
ব্যবহার করা প্লাস্টিক বর্জন করুন
ব্যবহার্য প্লাস্টিক যেমন-গ্লাস, প্যাকেট, স্ট্র এগুলো থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বেশি ছড়ায়। প্যাকেটজাত খাবারের ক্ষেত্রে এ ধরনের প্লাস্টিক বেশি ব্যবহার হয়। প্লাস্টিকের কাঁটা-চামচ, বাটি, ট্রে ইত্যাদি একবার ব্যবহার করার পর ফেলে দেওয়া উচিত।
পরিবেশবান্ধব ব্যাগের ব্যবহার
প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহার কমাতে পরিবেশবিদরা পরিবেশবান্ধব ব্যাগ ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। পরিবেশবান্ধব ব্যাগ, যেমন চট বা সুতির ব্যাগ ব্যবহার করুন। পোশাকের ক্ষেত্রেও সুতি, উল, লিনেনের পোশাক ব্যবহার করুন। পলিয়েস্টার জাতীয় পোশাক এড়িয়ে চলুন। একই জিনিস মাথায় রাখতে হবে নিত্য ব্যবহারের তোয়ালে, বিছানার চাদর বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও।
সামুদ্রিক খাবারে প্লাস্টিকের উপস্থিতি
সামুদ্রিক মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি দেখতে পেয়েছেন গবেষকেরা। সমুদ্রের পানিতে প্লাস্টিক বর্জ্য জমে থাকে। সে পানিতে বেড়ে উঠে মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী। সমুদ্রের পানিতে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রথমে মাছের দেহে প্রবেশ করে পরে সেই মাছ খাওয়ার ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।
প্লাস্টিকের প্রসাধন সামগ্রী ব্যবহার না করা
নিত্যদিনের শারীরিক পরিচর্যার সামগ্রীর মাধ্যমেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করতে পারে। মাজন, স্ক্রাব, প্রসাধনী কেনার আগে লেবেল দেখে নিন উপকরণের তালিকায় পলিথিন বা পলিপ্রপিলিন জাতীয় কোনো নাম রয়েছে কিনা। যদি থাকে তাহলে ওই ধরনের পণ্য ব্যবহার করা বন্ধ করুন।