আজহার মাহমুদ, চট্টগ্রাম অফিস
চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মুরাদপুর গ্রামের বাসিন্দা সিরাজ উল্লাহ। একসময় তার পরিবারের সবাই কৃষিকাজে যুক্ত ছিলেন। নিজেদের জমি ছাড়াও গ্রামের অনেকের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করতেন। কিন্তু গত তিন বছর ধরে তারা কৃষিকাজ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। তিন ভাইয়ের মধ্যে দুজন প্রবাসে এবং অন্য ভাই বর্তমানে একটি কারখানায় কাজ করছেন। আর পেশা পরিবর্তনের কারণ হিসেবে তারা বলছেন কৃষিজমি কমে যাওয়া এবং কৃষিতে খরচের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া।
শুধু সিরাজ নন, এই উপজেলার অন্য বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে এ ধরনের চিত্র দেখা গেছে। ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের মোহাম্মদ শহীদও একসময় ধান ও মৌসুমি সবজি চাষ করতেন। তবে তার সন্তানেরা এখন কলকারখানায় কাজ করেন। এক সন্তান প্রবাসে রয়েছেন। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, আগে যেখানে মানুষ জমি বর্গা দিতে অনুরোধ করত, সেখানে এখন চাষের জমিই খুব একটা নেই। যেগুলো আছে, সেগুলোতে চাষ করে স্বস্তি পাওয়া যায় না। কারণ, পার্শ্ববর্তী জমিগুলোতে বাড়িঘরসহ নানা স্থাপনা গড়ে উঠেছে।
সিরাজ, শহীদদের মতো চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় অনেক কৃষক পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন। একেকজনের পেশা পরিবর্তনের কারণ একেক রকম হলেও অনেকেই কৃষিকাজে আগ্রহ হারাচ্ছেন জমি কমে যাওয়ার কারণে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, জমি, খাল-জলাশয় ভরাট করে বাড়িঘর, ইটভাটা, শিল্পকারখানাসহ নানা স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে প্রতিবছর ১ শতাংশ কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। বাস্তবেও বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে এই চিত্র পাওয়া গেছে। কৃষিবিদ গিয়াসউদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, প্রতিবছর যে হারে কৃষিজমি কমছে, তাতে কৃষক চাষে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন। যদিও পেশা পরিবর্তনের পেছনে অন্য কয়েকটি কারণ আছে। এটাও একটা বড়ো কারণ। তবে সরকারের কৃষিবান্ধব নানা উদ্যোগের কারণে উত্পাদনে ঘাটতি তেমন নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের মিরসরাই, সীতাকুণ্ড, সাতকানিয়া, আনোয়ারাসহ বেশ কিছু উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, এক যুগ আগে যেসব পরিবারে কৃষিকাজ ছিল আয়ের প্রধান উত্স, বর্তমানে তাদের আয়ের উত্স ভিন্ন। প্রবাসে যাওয়া, গার্মেন্ট, শিল্পকারখানায় কাজ করে তারা জীবিকা নির্বাহ করছেন। যদিও কৃষি বিভাগ বলছে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ ও উন্নত জাতের বীজ ব্যবহারের কারণে আবাদযোগ্য জমি কমলেও ফসল উত্পাদন কমেনি। পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে আবাসস্থল, শিল্পকারখানাসহ নানা স্থাপনা নির্মাণের হার বেশি। এছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়ণে কৃৃষিজমি দ্রুত অকৃষি খাতে যাচ্ছে। বাদ পড়েনি সংরক্ষিত ভূমিও। সরকারি খাস ভূমি, জলাধার, বনাঞ্চল রক্ষায় আইন ও নীতিমালা অমান্য করে বেদখল হয়ে যাচ্ছে।
১৯৯৭ সালের কৃষি জরিপ অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ফসলি জমির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে চাষাবাদের আওতায় ছিল ২ লাখ ২৪ হাজার হেক্টর জমি। ২০১০ সালের হিসাব অনুযায়ী চট্টগ্রামের ফসলি জমির পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ২৩৫ হেক্টরে। ১৩ বছরে জমি কমেছে প্রায় ৬৮ হাজার ৭৬৫ হেক্টর।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) প্রতিবেদনে বলছে, দেশে বিভাগওয়ারি কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাওয়ার প্রবণতা চট্টগ্রাম বিভাগে বেশি। এই বিভাগে প্রতিবছর ১৭ হাজার ৯৬৮ হেক্টর জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে।
কৃষি অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৫ হাজার ২৮৩ বর্গ কিলোমিটারের এই জেলায় জনসংখ্যা ৮০ লাখ ২৫ হাজার ৩৩৫। মোট ফসলি জমি ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৩৭৭ হেক্টর।