ট্রাম্পের আমেরিকা কি শিশু-বৈরী?

আনুশে হোসেন

এই মুহূর্তে ক্যাপিটল হিল সম্ভবত ঘুমে আচ্ছন্ন। বিশেষ করে আগস্ট মাসের পুরোটাই যখন ইউএস কংগ্রেস ও সিনেট ছিল অধিবেশনের বাইরে। কিন্তু তারপরও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা আর অশান্তি রয়েছে তুঙ্গে। আর এর নেপথ্যে রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া বিভিন্ন পলিসি, যা পুরো আমেরিকাকে অবিরল ঝাঁকুনির মধ্যে রেখে দিয়েছে প্রতিনিয়ত।

গত সপ্তাহের কথাই ধরা যাক। মিসিসিপির সাতটি চিকেন প্রক্রিয়াজাত কারখানায় তল্লাশি চালান আমেরিকার অভিবাসন কর্মকর্তারা, গ্রেফতার করেন ৬৮০ জন কর্মীকে, যাদের মধ্যে বেশির ভাগই ল্যাটিন। উল্লেখ করার মতো ঘটনা এ কারণে যে, এই কর্মীরা কমপক্ষে এক দশক ধরে ঐ সব বড়ো কারখানায় নির্বিঘ্নে কাজ করে আসছিলেন। প্রায় ৬০০ ইউএস ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট কর্মীরা ঘিরে ফেলেছিলেন ঐ বিশাল চিকেন প্লান্টের সমস্ত অংশ, যাতে কেউ পালিয়ে যেতে না পারেন।

এমন ধরনের তল্লাশি যে চালানো হবে, তার পরিকল্পনা চলছিল বেশ কয়েক মাস ধরেই। তবে তাত্পর্যপূর্ণভাবে ট্রাম্প যেদিন টেক্সাসের এল পাসো সফর করেন, এর কয়েক ঘণ্টা আগে এসব ল্যাটিন কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। এল পাসো হলো টেক্সাসের যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর সীমান্তবর্তী এলাকা। গত ৩ আগস্ট টেক্সাসের ওয়ালমার্টের স্টোরে প্যাট্রিক ক্রুসিয়াস নামে এক শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদী যুবক বন্দুক হামলায় ২২ জনকে হত্যা করে। সিএনএনের খবর অনুযায়ী, হামলাকারী প্যাট্রিক ছিলেন অভিবাসী ও হিস্পানিক বিদ্বেষী। হামলার আগে অনলাইনে পোস্ট করা এক ‘ইশতেহারে’ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে হামলাকে সমর্থন জানায় ঐ বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসী। ‘যুক্তরাষ্ট্র কেবল শ্বেতাঙ্গদেরই দেশ’—এমন একটি উগ্র বর্ণবাদী ধারণা ছড়িয়ে পড়ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই। ট্রাম্পের গৃহীত বিভিন্ন নীতির ফলে উগ্র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীরা অশ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে উসকানি পাচ্ছে বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এসব উগ্রবাদীর দৃষ্টিতে অন্য জাতিগোষ্ঠীর লোকজন আমেরিকায় অনাহূত।

ট্রাম্প এমন একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফরম তৈরি করে ফেলেছেন এবং এমন কিছু প্রচারণা নিরন্তর পরিচালিত করে চলেছেন, যার মূল লক্ষ্য হলো অবৈধ অভিবাসী এবং মুসলিমদের বিতাড়িত করা। ট্রাম্পের জামানায় গত দুই বছর ধরে ট্রাম্প একেবারেই নিয়ম করে বর্ণবাদী ও আপত্তিকর ভাষায় আক্রমণ করে চলেছেন অশ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে।

যদিও আমি মনে করি, বিদ্যমান যেসব পলিসি রয়ে গেছে, সেগুলোও কম ভয়ংকর নয়। বিশেষ করে অভিবাসন প্রত্যাশী বাবা-মায়ের কাছ থেকে তাদের শিশুদের সীমান্ত থেকেই আলাদা করে ফেলার বিষয়টি। এভাবে সীমান্ত এলাকা থেকেই এখন পর্যন্ত হাজার হাজার শিশুকে আলাদা করা হয়েছে তাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে। এদের আর একসঙ্গে থাকার কোনো সম্ভাবনাই নেই বলা যায়। সুতরাং, এসব হিস্পানিক ও ল্যাটিন সম্প্রদায়ের লোকদের অনুভূতি ও কষ্ট অনুধাবন করা খুব কঠিন নয়। একজন মা হিসেবে, একজন অশ্বেতাঙ্গ নারী হিসেবে, একজন মুসলিম ও মানবিক মানুষ হিসেবে আমার হূদয় ভেঙে যায় এই ভেবে যে, কীভাবে একটি সম্প্রদায়কে কত ভয়ংকর ও নিষ্ঠুরভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে! 

লুইস কারটাজেনা নামের চার্চের একজন যাজক সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, এ ধরনের অভিবাসনবিরোধী অভিযান ল্যাটিন সম্প্রদায়ের মনে প্রচণ্ড অভিঘাত সৃষ্টি করছে। লুইস বলেন, অভিবাসীরা প্রচণ্ডভাবে আতঙ্কিত, এমনকি তারা মৃত্যুভয়ে সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

দুটি বন্দুক হামলার পর আমেরিকানরা তাদের বাচ্চাদের প্রথম দিনের স্কুলের ছবি ও ভিডিও পোস্ট করছেন, যেখানে দেখানো হচ্ছে বাবা-মা ছাড়া বাচ্চারা ত্রাহি চিত্কারে কান্নাকাটি করছে। এটা বাচ্চাদের প্রথম দিনের স্কুল, যখন তারা বাবা-মা থেকে আলাদা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, ল্যাটিনো ও হিস্পানিকদের কি বিশেষ কোনো ভূমিকা নেই আমেরিকার অর্থনীতিতে? আমেরিকার বেশিরভাগ বাড়িঘর যারা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখেন, বাচ্চাদের আয়া হিসেবে যারা কাজ করেন, আমেরিকার গৃহনির্মাণে যাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য এবং যাদের সংস্কৃতি, খাবার ও সংগীত আমেরিকানদের রক্তের শিরায় ঢুকে গেছে—সেই ল্যাটিনো ও হিস্পানিকদের প্রতি এতটা বৈরী মনোভাবাপন্ন হওয়া কী করে সম্ভব?

এসব মানুষকে আমেরিকা যতটা দিয়েছে, তার থেকে অনেক বেশি নিয়েছে। তারা আমেরিকার খাদ্য উত্পাদনে জড়িত, কায়িক শ্রমের কাজে তাদের অনেক বেশি সস্তায় ব্যবহার করে আমেরিকা। এসব অবৈধ অভিবাসী কর্মীর সস্তা শ্রমের জন্যই আমেরিকার অর্থনীতি নানা দিক থেকে বিকশিত। সুতরাং, ট্রাম্প কাদের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করছেন?

সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জামানার ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জন স্যান্ডওয়েগ সমালোচনা করেছেন ট্রাম্পের এমন অভিবাসনবিরোধী অভিযানের। তিনি এই অভিযানকে উল্লেখ করেছেন সম্পদের ব্যাপক অপচয় হিসেবে। তিনি স্পষ্টতই বলেন, সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হলো, এই অভিযানের মাধ্যমে আপনি কোনো প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে পাবেন না। বরং যাদের পাবেন, তারা কায়িক শ্রমিক—যারা তাদের পরিবারের খাদ্য সংস্থানের জন্য কাজ করে থাকেন। স্যান্ডওয়েগ অভিযোগের সুরে বলেন, আপনি অভিবাসনপ্রত্যাশী শিশুদের আলাদা করছেন তাদের বাবা-মায়ের কাছ থেকে এজন্য যে, আপনি শিশুদের নিরন্তর কান্না শুনতে চাইছেন।

এই অভিযানের বিরুদ্ধে দুঃখ প্রকাশ করে আমেরিকার দ্য ন্যাশনাল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশন ও মিসিসিপি অ্যাসোসিয়েশন অব এডুকেটর একটি বিবৃতি দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আমেরিকার ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট পরিচালিত অভিযানে প্রথম দিনের স্কুলে বাচ্চাদের থেকে তাদের বাবা-মাকে আলাদা করা সংক্রান্ত বিশৃঙ্খল ঘটনার ব্যাপারে আমরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। শিশু শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ ঘটনার মাধ্যমে যে অভিঘাত সৃষ্টি হয়েছে, তার স্থায়িত্ব ধারণাতীত। এবং এর একটি দীর্ঘমেয়াদি গভীরতর প্রভাব থেকে যাবে।    

সবচাইতে দুঃখের ব্যাপার হলো, এ ধরনের বিশৃঙ্খল ঘটনা ট্রাম্পের আমেরিকায় এত বেশি ঘটছে যে, আগের দিনের সংবাদ চাপা পড়ে যাচ্ছে পরের দিনের আরো একটি বাজে ঘটনার নিচে। কিন্তু আমেরিকানরা নিজেদের মনের দর্পণে কি এই প্রশ্ন প্রকাশ করে দেখেছেন—একটি শিশুকে কী করে তার বাবা-মা থেকে আলাদা করে দিতে পারে আমেরিকা? কী করে ওই পরিবারগুলোকে মানসিক অভিঘাতের চূড়ান্তে নিয়ে যেতে পারে সারা জীবনের জন্য? এবং দাসত্বের কলঙ্কময় ইতিহাস পার করে আমেরিকা কীভাবে তার ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করবে এসব অন্ধকার দিনের?

ইংরেজি থেকে অনুবাদ : অদ্বয় দত্ত

n লেখক : যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি সাংবাদিক, নারী অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ