আলোকপাত

তিনি আছেন আমাদের হূদয়ের গভীরে

লাভা মাহমুদা

খুব খুব ছোটো ছিলাম, কিছু বুঝে ওঠার বয়সই হয়নি তখন। হঠাত্ একদিন খেয়াল করলাম আমাদের পুরো বাড়ি কেমন যেন নিশ্চুপ, নিস্তব্ধ হয়ে আছে। সবাই কেমন যেন ঝিম মেরে আছে, ফিসফিস করে কথা বলছে। একটু পর পর খুব নিচু শব্দে রেডিও শুনছে। জানার খুব আগ্রহ হলো, কিন্তু কেউ কিছু বলছে না। তবে কোথাও যে কিছু একটা গোলমাল হয়েছে, বুঝতে পারছিলাম। গোলমাল যে হয়েছে, বড়ো হয়ে ঠিকই বুঝতে পারলাম। এখনো বিষণ্ন দুপুর-বিকালে সেই দিনটার কথাই ভাবী। সেই দিনটাতেই অন্ধকার নেমে এসেছিল এই ভূখণ্ডে, গভীর অন্ধকার। যে অন্ধকার ভেদ করে এখনো পুরোপুরি আলো ফুটছে না। দিনটি ছিল ১৫ আগস্ট ১৯৭৫। সেদিনই হত্যা করা হয়েছিল এ জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাকে, এ জাতির জনককে।

১৯২০ সালের ১৭ এপ্রিল টুঙ্গিপাড়ার নিভৃত পল্লিতে বেড়ে ওঠা দুরন্ত কৈশোরের সেই বালকটি কালের পরিক্রমায় ইতিহাস সৃষ্টি করে নিজেই হয়ে ওঠেন ইতিহাস। দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে না উঠলেও গ্রামীণ জনপদের দারিদ্র্যের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন সেই ছোটোবেলা থেকেই। মানুষের অভাব, দারিদ্র্য তাকে ছুঁয়ে যেত, কষ্ট দিত, তাড়িত করত। মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ, সংবেদনশীলতা, ভালোবাসা তার চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল। তাই তো মানুষের প্রতি ভালোবাসা থেকেই রাজনীতিতে জড়িয়েছিলেন সেই স্কুলজীবনেই। জেলও খেটেছেন সেই বালকবেলাতেই। রাজনীতি তার মননেই ছিল। রাজনীতির জন্যই তিনি নিজেকে তৈরি করেছেন, রাজনীতির কাছেই ছিল তার আত্মসমর্পণ। ১৯৪৮ থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এই ভূখণ্ডের সব আন্দোলন-সংগ্রামে  তিনি ছিলেন সংগঠক হিসেবে এবং নেতৃত্বে। তার চলার পথ বকুল বিছানো ছিল না, বন্ধুর পথে চড়াই-উত্রাই অতিক্রম করেই তিনি পেয়েছিলেন বাঙালি জাতির অকৃত্রিম ভালোবাসা। জেল-জুলুম ছিল তার জীবনের নিত্য সঙ্গী। জীবনের ১৩টি বসন্ত কেটেছে কারাভ্যন্তরে।

জীবনের পাঠশালা থেকে শিক্ষা নিয়ে ক্রমাগত নিজেকে ঋদ্ধ করেছেন, অতিক্রম করেছেন। অতিক্রম করেছেন তাদের, যাদের কাছ থেকে রাজনীতির পাঠ নিয়েছিলেন। কারো তৈরি করা পথ দিয়ে নয়, বরং নিজেই পথ তৈরি করে ধীরে ধীরে এগিয়েছেন ক্রমাগত সামনে। মানুষের মধ্যে থেকে, মানুষকে সঙ্গে নিয়ে রাজনীতির ইমারত গড়ে তুলেছিলেন বলে তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন, বিশ্বাস করতেন। বুদ্ধিমত্তায়, সৃজনশীলতায় সেরা বাঙালি হয়তোবা আরও পাওয়া যাবে, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মতো অসম সাহসী, দূরদর্শী এবং তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পারদর্শী রাজনৈতিক নেতা খুব বেশি নেই। প্রতিটি মানুষের জীবনের পরতে পরতে যেমন উপলব্ধি আসে, বঙ্গবন্ধুরও তাই হয়েছিল। অবশ্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি আরও জটিল। কারণ অনেক সময় ঘটনা না ঘটলে বোঝার উপায় থাকে না যে, কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক। পাকিস্তান আন্দোলনে শরিক থাকলেও ’৪৭-এ দেশভাগের অব্যবহিত পরই তিনি যখন বুঝতে পারলেন পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়াটা ছিল ঐতিহাসিক ভুল, তখন থেকেই শুরু হয় তার জীবনের বাঁক পরিবর্তনের লড়াই। তার জীবনের শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক কীর্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বদান। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।

তাঁর ছিল মানুষের প্রতি অগাধ বিশ্বাস। তাই তো তার জীবন শঙ্কার কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিলেও বিষয়টি তিনি একেবারেই আমলে নেননি। সেই সুযোগেই ঘাপটি মেরে থাকা ঘাতকের দল হত্যা করল স্বাধীন বাংলার স্থপতি, মহানায়ক, ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ বাঙালিকে।

এ দেশ, এ জাতি, এ ভূখণ্ড যত দিন থাকবে, তত দিনই তিনি থাকবেন প্রতিটি দেশপ্রেমিক বাঙালির অন্তরে। তিনি আছেন... ভীষণভাবেই আছেন, হূদয়ের গভীরে, অন্তরে, অলিন্দে, নিলয়ে।

n লেখক :শিক্ষক