তিন শিক্ষার্থীকে দফায় দফায় মারধর: আম্মারসহ ৯ শিবির নেতার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ দায়ের

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) প্রক্টর দফতর ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার এলাকায় তিন শিক্ষার্থীকে দফায় দফায় মারধর এবং পরবর্তীতে অ্যাম্বুলেন্স থেকে টেনে বের করে শারীরিক নির্যাতনের ঘটনায় রাজশাহী মেট্রোপলিটন আদালতে এক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান মাহিনের বাবা মো. আসাদুজ্জামান বাদী হয়ে রাজশাহীর মতিহার আমলি আদালতে এই হত্যাচেষ্টার আবেদন জানান। মামলায় রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মার ও সহকারী সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) সালমান সাব্বিরসহ মোট ৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৭ থেকে ১৮ জনকে আসামি করা হয়েছে।

নির্যাতনের শিকার মাহমুদুল হাসান মাহিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। মামলায় এজাহারনামীয় অন্য আসামিরা হলেন— নাজমুস সাকিব, মেহেদী সঞ্জীব, ফাহিম রেজা, আরিফুর ইসলাম, আহসান উল্লাহ ফাইহান, সিফাত আর সালেহ এবং নুরুল ইসলাম শহীদ।

আদালতে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৮, ৩২৩, ৩২৪, ৩২৫, ৩২৬, ৩০৭ ও ৩৪ ধারায় এই অভিযোগ দায়ের করা হয়। মামলার আরজিতে উল্লেখ করা হয়, গত ২৭ জুলাই দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মধ্যে আসামিরা রামদা, ছুরি, লোহার রড, বেল্ট ও বাঁশের লাঠিসহ মারাত্মক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মাহমুদুলকে ধাওয়া করেন। একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভেতরে ও বাইরে তাঁকে ঘিরে ধরে মারধর করা হয়।

অভিযোগপত্রে স্পষ্ট করে বলা হয়, রাকসু জিএস সালাউদ্দিন আম্মার রড দিয়ে মাহমুদুলের মাথা ও কপালে সজোড়ে আঘাত করেন। অন্যদিকে এজিএস সালমান সাব্বির মাথায় আঘাত করলে মাহমুদুলের বাম চোখ গুরুতর জখম হয়। অন্য আসামিরাও তাঁর বুক, পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি মারধর করে। একপর্যায়ে চার আসামি তাকে মাটিতে ফেলে বুক ও গলা চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা চালান বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।

ঘটনার পর শিক্ষক ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা মাহমুদুলকে চিকিৎসার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়ার উদ্যোগ নিলে আসামিরা সেখানেও বাধা সৃষ্টি করে। তারা তাকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে জোরপূর্বক টেনেহিঁচড়ে বের করে পুনরায় নির্যাতন চালায়। পরবর্তীতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়।

ভুক্তভোগীর বাবা আসাদুজ্জামান জানান, ঘটনার দিন বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ছেলের ওপর হামলার খবর পান এবং দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে ছেলেকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পান। তিনি অভিযোগ করেন, গত ২৮ জুলাই মতিহার থানায় লিখিত মামলা করতে গেলেও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তা গ্রহণ না করে আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

সহিংসতার পটভূমি বর্ণনা করতে গিয়ে জানা যায়, গত ২৭ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তরে একটি সাধারণ বিরোধকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত ঘটে। সেখানে রাকসু নেতারা আনাস নামের এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন 'বাংলাদেশ ছাত্রলীগ'-এর সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ উত্থাপন করেন। পরবর্তীতে আনাস ও তার সঙ্গীদের বিরুদ্ধে রাকসু কার্যালয়ে হামলার পাল্টা অভিযোগ ওঠে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাকসু নেতাকর্মী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মীরা লাইব্রেরির পাঠ কক্ষে ঢুকে শিক্ষার্থীদের মারধর করেন। এমনকি শিক্ষকদের উপস্থিতিতেও আহত মাহমুদুলকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে পিটিয়ে আহত করার দৃশ্য ভিডিও ফুটেজে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।

মামলার আইনজীবী হযরত আলী জানিয়েছেন, আদালত অভিযোগটি সরাসরি মামলা হিসেবে নথিবদ্ধ না করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) দায়িত্ব দিয়েছেন। একই সাথে তিনি উল্লেখ করেন, বাদী আবেগের বশে এই আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মাহিন বর্তমানে অন্য একটি মামলায় কারাগারে আটক রয়েছেন।