জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) দায়িত্ব নেওয়ার পর এক বছরে প্রায় ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকার বিভিন্ন উন্নয়ন, শিক্ষার্থীকল্যাণ, দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে জাকসু পেয়েছে মাত্র ১৮ লাখ টাকা। বাকি অর্থ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্পন্সরদের সহযোগিতায় সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে জাকসু ভবনের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সদ্য সাবেক এজিএস ফেরদৌস আল হাসান।
তিনি জানান, ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৮ সেপ্টেম্বর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শপথ নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণের পর শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ফার্মের সহযোগিতা এবং স্পন্সরশিপের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ফেরদৌস আল হাসান বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর এক বছরে জাকসু মোট ৩৩৮টি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। এর মধ্যে সভা-সেমিনার, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, আবাসিক হলে সরঞ্জাম সরবরাহ, দক্ষতা উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক আয়োজন রয়েছে।
উন্নয়ন ও অবকাঠামো
জাকসুর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার আধুনিকায়নে প্রায় ২৫ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। ২১টি আবাসিক হলে কম্পিউটার, ডেস্কটপ সেটআপ ও টেবিল সরবরাহে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।
এ ছাড়া আবাসিক হলগুলোতে গরম ও ঠান্ডা পানির সুবিধাসহ আধুনিক ফিল্টার স্থাপনে প্রায় ৭ লাখ টাকা এবং প্রতিটি হলে বুস্টার স্থাপনে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। ১৬টি আবাসিক হল ও কেন্দ্রীয় মন্দিরে ধর্মীয় পাঠাগার স্থাপনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮ লাখ ৮৯ হাজার টাকা।
শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সেবা সহজ করতে ‘টিউটর হাব’, ‘জাবি’ ও রক্তদানবিষয়ক ওয়েবসাইট তৈরিতে যথাক্রমে ৪৫ হাজার, ৫০ হাজার ও ৩৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। বাস ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু ও বাসে ট্র্যাকার মেশিন স্থাপনেও প্রায় ২ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে স্পন্সরশিপের কারণে এ খাতে জাকসুর প্রকৃত ব্যয় কমেছে বলে জানানো হয়।
জাকসুর নিজস্ব ওয়েবসাইট তৈরিতে ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে, যা পুরোপুরি স্পন্সরনির্ভর। ‘জাগরণ’ ও জাকসুর ম্যাগাজিন প্রকাশে পৃথকভাবে প্রায় ২ লাখ টাকা করে এবং জিমনেশিয়াম আধুনিকায়নে ৫ লাখ টাকার স্পন্সর সংগ্রহ করা হয়েছে।
শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন
শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার ও উচ্চশিক্ষার সহায়তায় ‘ক্যারিয়ার পাথ অ্যান্ড হায়ার এডুকেশন এক্সপো’ আয়োজন করা হয়। এতে দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেন এবং কর্মসূচিটির আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তবে এতে জাকসুর কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি।
‘ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন এক্সপো ২০২৬’-এ প্রায় ২ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী অংশ নেন। কর্মসূচিটির আর্থিক মূল্য প্রায় ৪ লাখ টাকা হলেও জাকসু থেকে দেওয়া হয় ২৫ হাজার টাকা।
বিনামূল্যে আইইএলটিএস কোর্সের দুই ধাপে ৭০০-এর বেশি শিক্ষার্থী সুযোগ পেয়েছেন। এ ছাড়া ‘বেসিক কম্পিউটার কোর্স’, ‘অ্যাডভান্স কম্পিউটার স্কিল ফর একাডেমিক ইউজ’ এবং ‘ফ্লুয়েন্ট ফিউচার ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্স’-এর মাধ্যমে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।
‘নেক্সট জেনারেশন রিসার্চ মেথডোলজি কোর্স উইথ রিসার্চ প্রজেক্ট’-এ প্রায় ৪৫০ শিক্ষার্থী অংশ নেন। কর্মসূচিটির আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ১৬ লাখ টাকা।
চাকরি ও স্বাস্থ্যসেবা
জাকসুর উদ্যোগে আয়োজিত জব ফেয়ারে প্রায় ৭ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেন। কর্মসূচিটির আর্থিক মূল্য প্রায় ১৬ লাখ টাকা হলেও স্পন্সরশিপের কারণে জাকসুর ব্যয় ছিল প্রায় ১ থেকে দেড় লাখ টাকা।
‘মেন্টাল হেলথ ফ্রি কাউন্সেলিং ক্যাম্প’-এ ৮০০-এর বেশি শিক্ষার্থী সেবা নেন। এতে প্রায় ২০ জন চিকিৎসক অংশ নেন এবং কর্মসূচিটির আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ৯ লাখ ৭৮ হাজার টাকা।
বিনোদন ও সাংস্কৃতিক আয়োজন
বিশ্বকাপ ফুটবল বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি স্থানে বিনামূল্যে সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়। জাকসুর হিসাবে, এ আয়োজনের আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ৩৮ লাখ টাকা।
নারী শিক্ষার্থীদের জন্য সাইকেল ও স্কুটি প্রশিক্ষণে সাত দিনে প্রায় ৫৫০ জন অংশ নেন। এ প্রকল্পে স্পন্সর প্রতিষ্ঠান ২০ লাখ টাকার বেশি ব্যয় করেছে বলে জানানো হয়।
সারা বছর ১৫টির বেশি সাংস্কৃতিক কর্মসূচি আয়োজনের পাশাপাশি তিনটি বড় কনসার্ট করা হয়। এসব আয়োজনে মোট ১৮ লাখ টাকার স্পন্সর সংগ্রহ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন হল সংসদ ও ক্লাবের কর্মসূচিতে জাকসুর বাজেট থেকে প্রায় ৩ লাখ টাকা নগদ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ হিসাব ২৪ সেপ্টেম্বর
জাকসুর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সীমিত অর্থ নিয়েও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্পন্সরের সহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নয়ন, শিক্ষা, গবেষণা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন ও বিনোদনমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।
আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর অডিট কমিটির কার্যক্রম শেষে জাকসুর পূর্ণাঙ্গ ব্যয়ের হিসাব উপস্থাপন করা হবে। সংবাদ সম্মেলনে জাকসুর সদ্য সাবেক ভিপি, জিএসসহ অন্যান্য প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

