বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের এক বিছানায় ঘুম, উপকার নাকি ঝুঁকি

সন্তান প্রতিপালনের প্রতিটি ধাপই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই নতুন মা-বাবারা শিশুকে নিয়ে যেকোনো বিষয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগেন। শুধু সময়মতো খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো কিংবা স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখা নয়, শিশুর আরও নানা খুঁটিনাটি ক্ষেত্রেও নজর দেওয়া জরুরি। যা সন্তানের সার্বিক বিকাশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

অনেক মা-বাবার মনে প্রশ্ন আসে, সন্তানকে কতদিন তাদের সঙ্গে শোওয়ানো উচিত। এর জন্য কি কোনো সঠিক বয়স আছে? কৌতূহল রয়েছে অনেক অভিভাবকেরই। এই সময়ের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়। 

সন্তানকে আলাদা ঘরে ঘুম পাড়ানো ভালো, নাকি মা–বাবার সঙ্গে একই বিছানায়? এই প্রশ্নে বহুদিন ধরেই চলছে আলোচনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ নিয়ম মেনে ছোট শিশুর সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমালে তার মানসিক বিকাশ, নিরাপত্তাবোধ এবং মা–বাবার সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হতে পারে। তবে একই সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা নিয়মও মেনে চলা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর জীবনের প্রথম দিকে মা–বাবার কাছাকাছি থাকা তার মধ্যে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করে। এতে শিশুর মানসিক বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং সে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। রাতে কান্না করলে দ্রুত সাড়া পাওয়া যায় বলেও শিশুর মানসিক চাপ কমে।

শিশু বিশেষজ্ঞদের ধারণা, শিশু কত দিন তার মা-বাবার সঙ্গে ঘুমাবে তার কোনো নির্দিষ্ট বয়স বা নিয়ম নেই। প্রতিটি শিশুই আলাদা এবং তাদের চাহিদাও আলাদা। তবে কিছু সাধারণ নির্দেশিকা রয়েছে, যা মা-বাবাকে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারে।

তবে অনেক দেশে শিশুকে ছোটবেলা থেকেই আলাদা ঘুমানোর অভ্যাস করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে শিশুর স্বাধীনতা বাড়ে। অন্যদিকে অনেক গবেষক মনে করেন, শিশুর কান্নাকে দীর্ঘ সময় উপেক্ষা করলে মানসিক চাপ বাড়তে পারে এবং তার আবেগগত বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই চলুন জেনে নেওয়া যাক শিশুর বয়স অনুযায়ী কী কী করা উচিত- 

১ বছর পর্যন্ত : এই বয়সে শিশুদের সবচেয়ে বেশি সুরক্ষা এবং তত্ত্বাবধানের প্রয়োজন হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের এক বছর বয়স পর্যন্ত তাদের মা-বাবার সঙ্গে একই ঘরে ঘুমানো উচিত। এতে রাতে শিশুর সঠিক যত্নের অবহেলা হয় না। 

১-৩ বছর : ১ থেকে ৩ বছর বয়সী শিশুরা আবেগগতভাবে খুব বেশি মা-বাবার সঙ্গে যুক্ত থাকে। রাতে মাঝে মাঝে ভয় পেতে পারে অথবা জেগে উঠতে পারে।

এই ধরনের পরিস্থিতিতে তাদের মা-বাবার উপস্থিতি আশ্বস্ত করে। তাই এই বয়সেও শিশুকে বাবা-মায়ের ঘরে ঘুমাতে দেওয়াই উচিত।
৩-৬ বছর : শিশু বিশেষজ্ঞরা বলেন, এটি একটি পরিবর্তনের সময়। শিশুরা ধীরে ধীরে তাদের পরিচয় এবং স্থান বুঝতে শুরু করে। এই সময়ে মা-বাবার সন্তানকে তার নিজস্ব পৃথক বিছানা বা ঘরের জন্য ধীরে ধীরে প্রস্তুত করতে শুরু করা উচিত। তবে এই পরিবর্তনটিতে কোনো তাড়াহুড়ো করলে চলবে না।

 ৬ বছর এবং তার বেশি : যদি শিশু প্রস্তুত থাকে এবং মা-বাবা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তাহলে ছয় বছর বয়সের পর শিশুকে আলাদা ঘরে ঘুমাতে দেওয়া ঠিক সিদ্ধান্ত। এই বয়স বোধগম্যতা এবং স্বাধীনতা বিকাশে সাহায্য করে।

তবে মনে রাখবেন, প্রতিটি শিশুই আলাদা, তাই কেবল সামাজিক চাপের ওপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশুর মা-বাবার থেকে আলাদাভাবে ঘুমানো একটি স্বাভাবিক ও আরামদায়ক পদক্ষেপ হওয়া উচিত, জোর করে নয়। যদি শিশুটি ভয় পায়, কাঁদে, অথবা বারবার মা-বাবার কাছে ছুটে যায়, তাহলে তাদের আরো কিছুটা সময় দেওয়া জরুরি। এর অর্থ হলো কখন শিশুকে আলাদাভাবে ঘুমাতে দেওয়া হবে সেই সিদ্ধান্ত মা-বাবা ও শিশু উভয়ের অনুভূতির কথা মাথায় রেখে নেওয়া প্রয়োজন।

এ ব্যাপারে হাদিসের ভাষ্য অনুপাতে সন্তানের বয়স ১০ বছর হলে সেই সন্তানকে পৃথক বিছানায় বা আলাদা করে শুয়ানো আবশ্যক। একসঙ্গে থাকা যাবে না। যদিও বাবার সঙ্গে ছেলের এবং মায়ের সঙ্গে মেয়ের শোয়ার অবকাশ আছে। তবে এ ক্ষেত্রেও আলাদা থাকার সুযোগ থাকা অবস্থায় এমনটি করা উচিত নয়। আর হাদিসের কিছু বর্ণনায় সাত বছরের কথাও এসেছে।

সেই হিসেবে সাত বছর বয়স হলেই বিছানা পৃথক করার ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিত। তবে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সুযোগ আছে। ১০ বছর হয়ে গেলে বিছানা পৃথক করা ওয়াজিব।সামর্থ্য থাকার পরও তা না করলে গুনাহ হবে।

আমর ইবনু শুয়াইব (রহ.) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে তাদের সালাতের জন্য নির্দেশ দাও। যখন তাদের বয়স ১০ বছর হয়ে যাবে, তখন (সালাত আদায় না করলে) এ জন্য তাদের মারবে এবং তাদের ঘুমের বিছানা আলাদা করে দেবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৫)

আবদুল মালিক বিন রাবি বিন সাবরাহ পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন সন্তানের বয়স সাত বছর হয়, তখন তার বিছানা আলাদা করে দাও।’ (দারা কুতনি, হাদিস : ৮৮৬)

সুতরাং সন্তানের বয়স সাত বছর হলে বিছানা পৃথক করে দেওয়া উচিত। আর ১০ বছর হয়ে গেলে যথাসাধ্য বিছানা একসঙ্গে রাখা যাবে না।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সন্তানের চাহিদা, বয়স এবং মানসিক প্রস্তুতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া। কারণ ভালো প্যারেন্টিং মানে শুধু সন্তানের পাশে থাকা নয়, সময়মতো তাকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সাহসও দেওয়া।