ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) ও কিস্টোন বিজনেস সাপোর্ট কর্তৃক প্রকাশিত সামপ্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, গ্যাস সরবরাহে পর্যাপ্ত প্রেসার বা চাপ না থাকিলে কারখানার জ্বালানির মূল্যসহ সার্বিক পরিচালন ব্যয় বাড়িয়া যায় কয়েক গুণ। বিদ্যুত্, ইস্পাত, টেক্সাটাইল, ডেনিম ও সিমেন্ট কারখানার ওপর মাঠপর্যায়ে পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে তৈরি করা হইয়াছে এই প্রতিবেদন। গ্যাসের এই অপর্যাপ্ত সরবরাহের কারণে টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক কারখানার বয়লারগুলো প্রয়োজনীয় তাপ তৈরি করিতে পারে না। ফলে উত্পাদন বন্ধ রাখিতে হয় কারখানায়। অথবা ব্যবহার করিতে হয় ক্যাপটিভ পাওয়ার, যাহার সক্ষমতাও চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত থাকে না। এই পরিস্থিতিতে কিছু কারখানায় ব্যবহার করা হয় বাড়তি মূল্যের সিএনজি। এইসব কারণে কোম্পানিগুলোর জ্বালানি বাবদ পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধি পায় ১০ হইতে ৪৫ শতাংশ।
জরিপে দেখা গিয়াছে, যে কারখানায় ১০ পিএসআই (পাউন্ড ফোর্স পার স্কয়ার ইঞ্চ) চাপে গ্যাস প্রয়োজন, সেখানে বাস্তবে কখনোই আড়াই হইতে সাড়ে তিন পিএসআইয়ের বেশি গ্যাস পাওয়া যায় না। ইহাতে গ্যাসের প্রকৃত মূল্যহার প্রতি ঘনমিটারে ৭ টাকা ৭৬ পয়সার বদলে খরচ দাঁড়ায় ১৫ টাকা ৫২ পয়সা। আবার বিদ্যুেকন্দ্রে গ্যাসের কাঙ্ক্ষিত চাপ যেখানে ১৫০ পিএসআই, সেখানে তাহা সবসময় ১০০-১২০ পিএসআইয়ে উঠা-নামা করে। এইসকল কারণে অনেক কারখানার মালিক কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগ করিয়াও কেবল গ্যাসের প্রেসার না পাওয়ার কারণে কারখানা বন্ধ রাখিতে বাধ্য হন। ইহাতে পড়িয়া থাকে তাহার কোটি কোটি টাকা মূল্যের মেশিনপত্র। জ্বালানির অভাবে এভাবেই বাড়িতে থাকে লোকসান। এখন প্রশ্ন হইল, গ্যাসের চাপ কম থাকিবার কারণ কী? আসলে এইজন্য শিল্পাঞ্চলের আশেপাশে অবৈধ আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প সংযোগই প্রধানত দায়ী। কারণ গ্যাস বিতরণ লাইন ও সংযোগের অবস্থান যত কাছাকাছি হইবে, চাপের পরিমাণও তত বেশি হইবে। কিন্তু বিতরণ লাইন ও শিল্পকারখানার সংযোগের মধ্যে অবৈধ সংযোগ বাড়িয়া যাওয়ায় কারখানা পর্যন্ত পৌঁছাইতে পৌঁছাইতে গ্যাসের চাপ কমিয়া যায়। সুতরাং সর্বাগ্রে এই অবৈধ সংযোগ বন্ধ করিতে হইবে। ইহার পাশাপাশি বাড়াইতে হইবে দেশি গ্যাসের মজুদ। এইজন্য অনুসন্ধান ও জ্বালানি ব্যবহারে বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন। প্রয়োজন শিল্পকারখানার পুরাতন মিটারগুলিকে ইলেক্ট্রনিক ভলিউমেট্রিক ক্যারেক্টর (ইভিসি) মিটার দিয়া প্রতিস্থাপন করা। নূতন মিটার অনুযায়ী ভলিউম পরিমাপের ব্যবস্থা থাকিলে এইসকল প্রতিষ্ঠানের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইবার আশঙ্কা থাকিবে না।
উল্লেখ্য, গ্যাসের চাপজনিত সমস্যা সবচাইতে বেশি দেখা যায় গাজীপুর, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ, সাভার ও আশুলিয়া এলাকায়। এই সমস্যার কারণে এখানকার, বিশেষত তৈরি পোশাক কারখানার মালিকগণ ব্যবসা টিকাইয়া রাখিতে হিমশিম খাইতেছেন। তবে আশার কথা হইল— তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ শুরু হওয়ায় বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামে যেমন গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হইয়া আসিয়াছে, তেমনি রাজধানী ও ইহার আশেপাশে সরবরাহ শুরু হইলে এখানকার সংকটও কাটিয়া যাইবে নিঃসন্দেহে। আমদানিকৃত এই এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য ইতোমধ্যে চট্টগ্রামের মহেশখালীতে নির্মাণ করা হইয়াছে একটি ভাসমান টার্মিনাল। গত ১৮ আগস্ট ইহা হইতে গ্যাস সরবরাহ শুরু হইয়াছে। বর্তমানে আমাদের দেশে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট হইলেও এলএনজিসহ দৈনিক গ্যাস উত্পাদিত হইতেছে ৩০০ কোটি ঘনফুট। অতএব, আমদানিকৃত এলএনজি আমাদের জ্বালানির ঘাটতি পূরণে বড় ধরনের ভূমিকা রাখিতে পারে। তাহারপরও অবৈধ গ্যাসের সংযোগ উচ্ছেদ করিয়া বিতরণ ব্যবস্থার উন্নতি একান্ত প্রয়োজন।