আমেরিকার ৪১তম প্রেসিডেন্ট জর্জ হারবার্ট ওয়াকার বুশের ৯৪ বছরের বর্ণিল জীবনের অবসান ঘটেছে গত শুক্রবার রাতে। তার মৃত্যুতে ওয়াশিংটন ডিসিতে যে শোক ছেয়ে গেছে, তা ছড়িয়ে পড়েছে সারা আমেরিকায়। শেষবারের মতো জর্জ এইচ. ডাব্লিউ. বুশ ক্যাপিটল হিল থেকে বিদায় নিলেন চিরতরে, ওয়াশিংটন ন্যাশনাল ক্যাথিড্রাল সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করল।
আমেরিকার সাবেক সকল জীবিত প্রেসিডেন্ট গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন সিনিয়র বুশের গৌরবময় জীবন, রাজনীতিতে উঠে আসার ঘটনা। স্মৃতি রোমন্থনের তালিকায় ছিলেন সিনিয়র বুশের জ্যেষ্ঠপুত্র সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াকার বুশ থেকে শুরু করে ওবামা, ক্লিনটন, জিমি কার্টার প্রমুখ। এমনকী বেশ বিস্ময়ের সঙ্গে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন। ট্রাম্প এসময় জি-২০ সফরে আর্জেন্টিনায় অবস্থান করছিলেন, সিনিয়র বুশের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার দিনটিকে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন জাতীয় শোক দিবস হিসেবে। এমনকী জি-২০-এর সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করেন সিনিয়র বুশের সম্মানে। ট্রাম্পের এটুকু সম্মান জ্ঞাপনের ঔদার্য ঘটেনি আমেরিকার আরেক মহানায়ক জন ম্যাককেইনের প্রয়াণের পর, যিনি এ বছর আগস্টের শেষার্ধে মৃত্যুবরণ করেন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়ে।
ম্যাককেইন ছিলেন সেইসব হাতেগোনা রিপাবলিকানদের একজন, যিনি জনসম্মুখে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন সীমা লঙ্ঘন না করতে। মস্তিষ্কের ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করার আগে নিজের মুক্ত মানসিকতার সঙ্গে অমিল হলে ম্যাককেইন নিজের দলের বাইরেও ভোট দিতে দ্বিধা করতেন না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি তিনি এতটাই বীতশ্রদ্ধ ছিলেন যে, নিজের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ট্রাম্পকে তিনি অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়নের সময় সিনিয়র বুশের ছেলে জেব বুশকেও অসম্মান করেছিলেন। তা সত্ত্বেও ঔদার্যের পরিচয় দিয়ে সিনিয়র বুশ তাকে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অনাহুত বলেননি।
আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস প্রদেশের মিলটন শহরের এক অভিজাত পরিবারে ১৯২৪ সালের ১২ জুন সিনিয়র বুশের জন্ম। বাবা প্রেসকট ছিলেন পেশায় ব্যাঙ্কার। কানেকটিকাটের সিনেটর হিসেবে মার্কিন কংগ্রেসেও নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিলাভের আগেই মাত্র ১৮ বছর বয়সে মার্কিন নৌসেনায় যোগ দেন সিনিয়র বুশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৫ সালে বিয়ে করেন বারবারা পিয়ার্সকে। তাঁদের ছয় সন্তান হয়। তবে শৈশবেই মারা যায় রবিন নামে এক সন্তান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশসহ বাকি চার সন্তান যথাক্রমে জব, নিল, মার্ভিন ও ডোরো। প্রেসিডেন্ট নিক্সনের জমানায় ১৯৭১-৭৩ সময়কালে জাতিসংঘে আমেরিকার রাষ্ট্রদূতের ভূমিকা পালন করেছেন সিনিয়র বুশ। তার আগে টেক্সাস থেকে মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ, হাউস অফ রিপ্রেজেনটেটিভে নির্বাচিতও হয়েছেন। এরপর ডিরেক্টর অফ সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্সের গুরুত্বপূর্ণ পদের ভার পেয়েছিলেন বুশ। ১৯৮১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হওয়ার পরে রোনাল্ড রিগান পত্রপাঠ তাঁর ‘রানিং মেট’ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সিনিয়র বুশকে। পরবর্তী আট বছর ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে কাজ করার অভিজ্ঞতা ওভাল অফিসের দায়িত্ব সামলানোর ক্ষেত্রে তার খুব কাজে লেগেছিল। ২০১১ সালে সিনিয়র বুশকে আমেরিকার সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘মেডাল অফ ফ্রিডম’-এ ভূষিত করেন তাঁর একদা কট্টর সমালোচক বারাক ওবামা।
‘দ্য আমেরিকান প্রেসিডেন্টস’ ক্লাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা। এখানে সবসময়ই অতীতের রেষারেষি আর ভবিষ্যত্ উত্তরসূরি নিয়ে একটা জটিল অবস্থা দেখা যায়। তবে রাজনীতিতে তাদের যতোই মতাদর্শ থাকুক, ‘ওভাল অফিস’ পরিচালনায় তারা তাদের অভিজ্ঞতার সবটুকু দিয়ে থাকেন। তবে এটা জানা অসম্ভব যে, এই ক্লাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভূমিকা এখন কতটুকু আছে। তবে গায়ে জ্তালা ধরানো বিভিন্ন মন্তব্য, কটাক্ষ আর নোংরা সমালোচনার কারণে দলমত নির্বিশেষে প্রায় সকলেই ট্রাম্পকে সহ্যসীমার বাইরে ফেলে রেখেছেন। গত এপ্রিলে সিনিয়র বুশের স্ত্রী বারবারা বুশও মৃত্যুর আগে আঘাত পেয়েছিলেন ট্রাম্পের অশোভন বক্তব্যে। বারবারা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন, কিছু মানুষ কীভাবে ট্রাম্পকে সমর্থন করতে পারেন? বারবারা বুশ তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ট্রাম্পকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছিলেন।
ট্রাম্পের রাশিয়া-সম্পৃক্ততা সংক্রান্ত তদন্তের বিশেষ প্রসিকিউটর রবার্ট মুলার এ বছর বলেছেন যে, ট্রাম্পকে খুব কাছ থেকে অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেয়েছেন তিনি। সেই পর্যবেক্ষণের সূত্রেই তিনি এই উপসংহার টানেন যে, ট্রাম্প কখনোই সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ হারবার্ট ওয়াকার বুশ বা অন্য কোনো প্রেসিডেন্টের সমকক্ষ হতে পারবেন না, জীবিত অবস্থায় কিংবা মৃত্যুর পরও।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ : তাপস কুমার দত্ত
n লেখক : যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি সাংবাদিক, নারী অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ