উপকূলীয় জনপদের চার লাখের বেশি মানুষের চিকিৎসার একমাত্র সরকারি ভরসা পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। শুধু গলাচিপা নয়, পাশের রাঙ্গাবালী ও দশমিনা উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষও জরুরি চিকিৎসার জন্য ছুটে আসেন এ হাসপাতালে। তবে চিকিৎসক ও জনবল সংকট, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব, জরাজীর্ণ ভবন এবং ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি রোগীর চাপে হাসপাতালটির স্বাস্থ্যসেবা চলছে অনেকটা জোড়াতালির ওপর।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে প্রতিদিনই রোগীর উপচেপড়া ভিড়। শয্যা না পেয়ে অনেক রোগীকেই মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও কক্ষের ছাদ এবং দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। পুরোনো ভবনে চিকিৎসা নিতে এসে রোগী ও স্বজনদের আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। একই ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বড় সংকটগুলোর একটি হলো আলট্রাসনোগ্রাম (আলট্রাসাউন্ড) সেবা। প্রায় সাত-আট বছর ধরে গাইনি বিভাগের আলট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। ফলে গর্ভবতী নারীসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে বাধ্য হয়ে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের ভোগান্তিও বেড়েছে।
ডিজিটাল যুগেও হাসপাতালটিতে নেই আধুনিক ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন। কর্তৃপক্ষ জানায়, বহু বছরের পুরোনো অ্যানালগ এক্স-রে মেশিনটিও দীর্ঘদিন ধরে অচল। ফলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে রোগীদের বাইরে যেতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসায় বিলম্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
সরকারিভাবে ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে বাস্তবে প্রতিদিন ইনডোরে ১৫০ থেকে ২০০ রোগী ভর্তি থাকেন। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন আরও ৩০০ থেকে ৪০০ রোগী। অর্থাৎ নির্ধারিত ধারণক্ষমতার তিন থেকে চার গুণ বেশি রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে হাসপাতালটিকে। অতিরিক্ত রোগীর কারণে প্রায়ই দেখা দেয় শয্যা সংকট। অনেক সময় মেঝেতেই রোগীদের চিকিৎসা দিতে হয়।
জনবল সংকটও দীর্ঘদিনের। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র মিলিয়ে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ২৭৩টি। এর মধ্যে কর্মরত আছেন ১৪২ জন। শূন্য রয়েছে ১৩১টি পদ।
এর মধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনুমোদিত ২২৭টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৩১ জন। শূন্য রয়েছে ৯৬টি পদ। অন্যদিকে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে অনুমোদিত ৪৬টি পদের মধ্যে কর্মরত মাত্র ১১ জন। দীর্ঘদিন ধরে ৩৫টি পদ শূন্য থাকায় প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে।
চিকিৎসা সরঞ্জামের পাশাপাশি ওষুধ ও পরীক্ষার রিএজেন্ট সংকটও রয়েছে। হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের দাবি, রোগীর তুলনায় সরকারি বরাদ্দ অপ্রতুল হওয়ায় বছরের শেষ দিকে ওষুধ ও রিএজেন্টের সংকট দেখা দেয়। ফলে অনেক রোগীকেই বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে এবং বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে হয়।
পর্যাপ্ত কক্ষ না থাকায় অনেক সময় একই কক্ষে একাধিক চিকিৎসক রোগী দেখেন। এতে রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা এবং স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে।
গলাচিপা পৌর এলাকার বাসিন্দা প্রান্ত শীল বলেন, “চিকিৎসার জন্য সাধারণ মানুষ এই হাসপাতালের ওপরই নির্ভরশীল। কিন্তু প্রয়োজনীয় অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে বাইরে যেতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটোই বেশি লাগে। দ্রুত আধুনিক যন্ত্রপাতি, নতুন ভবন ও প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা দরকার।”
চরকাজল ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. শাহ আলম বলেন, “সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসা পাওয়ার আশায় আসি। কিন্তু অনেক পরীক্ষা বাইরে করাতে হয়। এতে খরচ ও ভোগান্তি দুটোই বাড়ে।”
এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মেজবাহ উদ্দিন বলেন, “গলাচিপা ছাড়াও রাঙ্গাবালী ও দশমিনা উপজেলার বিপুলসংখ্যক রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু এটি মাত্র ৫০ শয্যার হাসপাতাল হওয়ায় রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেক সময় শয্যা না থাকায় মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দিতে হয়।”
তিনি বলেন, “রোগীর সংখ্যার তুলনায় ওষুধ ও রিএজেন্টের বরাদ্দ অপ্রতুল। বরাদ্দ বাড়ানো হলে আরও ভালো সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। গাইনি বিভাগের আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট। নতুন মেশিনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে। বর্তমানে থাকা অ্যানালগ এক্স-রে মেশিনটিও আধুনিক চিকিৎসাসেবার জন্য উপযুক্ত নয়।”
হাসপাতাল ভবনের বিষয়ে তিনি বলেন, “ভবনটি অনেক পুরোনো। বিভিন্ন সময় সংস্কার করা হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য নতুন ভবন নির্মাণ প্রয়োজন।”
স্থানীয়দের দাবি, উপকূলীয় অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে দ্রুত ১০০ শয্যায় উন্নীত করা, নতুন ভবন নির্মাণ, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ, শূন্য পদে জনবল নিয়োগ এবং ওষুধ ও রিএজেন্টের বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তাদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে উপকূলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘদিনের সংকট অনেকটাই দূর হবে।