প্রকৃত সাফল্য ও সম্পদ কী?

একজন ভদ্রমহিলা তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে দেখলেন, বাড়ির সামনে তিনজন অচেনা বৃদ্ধ বসে আছেন। তাই বললেন, ‘আমি আপনাদের কাউকেই চিনতে পারলাম না, কিন্তু আপনারা হয়তো ক্ষুধার্ত। আপনারা ভেতরে আসুন, আমি আপনাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করছি।’ তারা জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাড়ির কর্তা কি আছেন? মহিলা বললেন, ‘না। তিনি বাইরে গেছেন।’ ‘তাহলে আমরা আসতে পারব না।’ সন্ধ্যায় যখন বাড়ির কর্তা ঘরে ফিরে সব শুনলেন তখন তিনি বললেন, ‘যাও, তাদের বলো যে আমি ফিরেছি এবং তাদেরকে ঘরে আসার জন্যে অভ্যর্থনা জানাচ্ছি।’ মহিলা বাইরে গেলেন এবং তাদের ভিতরে আসতে বললেন। তারা বললেন, ‘আমরা এভাবে যেতে পারি না।’ মহিলা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিন্তু কেন? আবার কী সমস্যা?’ বৃদ্ধ লোকদের মধ্যে একজন বললেন, ‘আমাদের মধ্যে একজনের নাম সম্পদ।’ আরেকজনের দিকে নির্দেশ করে বললেন, ‘তার নাম সাফল্য এবং আমি ভালোবাসা। এখন আপনি ভেতরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিন আমাদের মধ্যে কাকে আপনি ভেতরে ঢুকতে দেবেন।’ মহিলা যখন ভিতরে গিয়ে সব খুলে বললেন, তখন তার স্বামী অত্যন্ত খুশি হয়ে বললেন, ‘অসাধারণ! চলো, আমরা সম্পদকে ডাকি, তাহলে আমরা ধনী হয়ে যাব।’ তার স্ত্রী এতে সম্মতি দিলেন না। ‘নাহ, আমার মনে হয় আমাদের সাফল্যকেই ডাকা উচিত।’ তাদের মেয়ে ঘরের অন্য প্রান্তে বসে সব শুনছিল। সে বলে উঠল, ‘তোমাদের কি মনে হয় না আমাদের ভালোবাসাকেই ডাকা উচিত? তাহলে আমাদের ঘর ভালোবাসায় পূর্ণ হয়ে উঠবে!’ লোকটি বললেন, ঠিক আছে, আমরা তাহলে আমাদের মেয়ের কথাই শুনব, তুমি বাইরে যাও এবং ভালোবাসাকেই আমাদের অতিথি হিসেবে ডেকে নিয়ে এসো।’ মহিলাটি বাইরে গেলেন এবং বললেন, আপনাদের মধ্যে ভালোবাসা কার নাম? অনুগ্রহ করে তিনি ভেতরে আসুন, আপনিই আমাদের অতিথি।’ ভালোবাসা নামের বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন এবং বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলেন, বাকি দু’জনেও উঠে দাঁড়ালেন এবং তাকে অনুসরণ করতে লাগলেন। মহিলাটি এতে ভীষণ অবাক হয়ে গেলেন এবং বললেন, ‘আমি তো শুধু ভালোবাসা নামের বৃদ্ধকে ভেতরে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছি, আপনারা কেন তার সঙ্গে আসছেন? বৃদ্ধদের একজন তখন বললেন, আপনি যদি সম্পদ অথবা সাফল্যকে আমন্ত্রণ করতেন, তবে আমাদের বাকি দু’জন বাইরেই থাকতাম, কিন্তু আপনি যেহেতু ভালোবাসাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, সে যেখানে যায়, আমরা দু’জনও সেখানেই যাই। যেখানে ভালোবাসা থাকে, সেখানে সম্পদ আর সাফল্যও থাকে।

জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই দৃষ্টি দিলে আমরা ভালোবাসার সঙ্গে সাফল্য ও সম্পদের নিবিড় সম্পর্ক উপলব্ধি করি। বিশ্ববিখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড় পেলের জীবন ইতিহাস পড়লে দেখা যায় অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য না থাকার কারণে খড়-কুটো আর কাগজ দিয়ে ফুটবল বানিয়ে তিনি খেলতেন। ফুটবলের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা তাকে বিশ্ব সেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি দিয়েছে। গবেষণাকে ভালোবাসতেন বলে স্যার আইজ্যাক নিউটন বহু বছরের গবেষণা ও নিবন্ধ তার পোষা কুকুর মোমবাতির আগুন ফেলে পুড়িয়ে দেওয়ার পরেও হতোদ্যম হননি। তিনি পূর্ণ ধৈর্যসহকারে আবার গবেষণা নিবন্ধগুলো লিখেছিলেন। বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন রেলগাড়িতে যাত্রাপথে গবেষণা করতে গিয়ে ট্রেনের কামরায় আগুন ধরিয়ে দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে রেলের কনডাক্টর তার গালে জোরে চড় মারেন। ফলে তিনি পরবর্তীকালে কানে কম শুনতেন। জীবনের এই শারীরিক ক্ষতি তাকে গবেষণা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি প্রায় ২৩৩২টি আবিষ্কারের পেটেন্ট তৈরি করেছেন। বৈদ্যুতিক বাতির মূল্য সাশ্রয়ী ফিলামেন্ট তৈরির সময় তিনি প্রায় এক হাজারবার বিভিন্ন ধাতুর মিশ্রণ নিয়ে ফিলামেন্ট তৈরি করেন। কিন্তু এতে কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি। সে সময় তার গবেষণা সহকারী বলেছিলেন, “আমাদের এক হাজারবার চেষ্টা বিফলে গেল।” কথাটি শুনে এডিসন বলেছিলেন, “আমাদের গবেষণা মোটেও বিফলে যায়নি। এই বিষয় নিয়ে যদি অন্য কেউ গবেষণা করে তবে এই এক হাজার মিশ্রণ বাদ দিয়ে গবেষণা করবে। অর্থাত্ আমরা গবেষণার কাজ এগিয়ে রাখলাম।” এমন ইতিবাচক মন্তব্য শুধু কাজের প্রতি গভীর ভালোবাসা থাকলেই করা সম্ভব। কাজের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা তাকে জীবনে সাফল্য, সম্পদ দুটিই দিয়েছিল।

আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রকৃত সাফল্য এবং সম্পদ গড়ার মূলে ভালোবাসা নামক মানবীয় গুণাবলির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আমরা যে যেখানে কর্মরত তারা সেই কাজের প্রতি আন্তরিক থাকলে সেই কাজ অবশ্যই আমাদেরকে সাফল্য ও সচ্ছলতা দিবে। আমরা যারা নিজ নিজ অবস্থানে কর্মরত তারা কি আমাদের কাজ দায়সারাভাবে করছি, নাকি ভালোবাসা থেকে সমস্ত মনোসংযোগ দিয়ে করছি— তা ভেবে দেখতে হবে। আমরা যদি কর্মক্ষেত্রে নিজের কাজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও মমত্বের দৃষ্টিতে না তাকাই তাহলে কোনোভাবেই সেখান থেকে সাফল্য ও সচ্ছলতা অর্জন সম্ভব নয়। কোনো কিছু অর্জনের মূলে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম। আর এই কঠোর পরিশ্রম করা সম্ভব কেবল কাজটিকে ভালোবাসতে পারলে। ভালোবাসতে শিখতে বিশেষ কিছু দরকার নেই, শুধু দরকার ইতিবাচক ও কৃতজ্ঞ দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার।

n লেখক: অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর-১৭০৭।