গাজার আল-বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে রাতের আঁধারে এক নির্মম হামলার শিকার হয়েছে আরেকটি পরিবার। ১৫ মাস বয়সী শিশু জাইদ নোফাল ঘুমিয়েছিল খোলা জানালার পাশে। প্রচণ্ড গরমে একটু বাতাস পাওয়ার আশায় তাকে সেখানে রাখা হয়েছিল। রাত তিনটার দিকে ইসরায়েলি বিমান হামলায় বাড়িটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলে শিশুর নিথর দেহ উদ্ধার করা হয় সেই ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে।
শনিবার ( ১ আগস্ট) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
হামলার পর মাত্র কয়েক মিটার দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার মা ফাতিমা নোফাল। ৩৮ বছর বয়সী এই ফিলিস্তিনি নারীর চারপাশে তখন রক্ত আর ধুলো, প্রতিবেশীদের চিৎকার। তিনি নিজেও আহত। তবু জায়গা ছাড়েননি। প্রতিবেশীদের ডেকে শিশুকে খুঁজে বের করার আকুতি জানিয়েছেন। অবশেষে ধ্বংসস্তূপ থেকে তুলে একটি পাতলা চাদরে মুড়িয়ে জাইদকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু সে আর ফেরেনি।
এটি ফাতিমার চতুর্থ সন্তানের মৃত্যু। ২০২৩ সালের ১৩ অক্টোবর ইসরায়েলি হামলায় তিনি হারিয়েছিলেন তিন ছেলেকে। তারা হলেন, ১৬ বছরের আমিন, ১১ বছরের হামজা এবং মাত্র ২২ দিন বয়সী আহমেদ। সেদিন কেবল তিনি ও দুই মেয়ে বেঁচে গিয়েছিলেন। যুদ্ধ শুরুর পর পরিবারটি সীমান্ত এলাকা থেকে আল-জাওয়াইদার আল-সাওয়ারহা এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিল। ভেবেছিলেন সেখানে নিরাপদ থাকবেন। কিন্তু ঠিক সেখানেই চোখের সামনে তিন সন্তান ও স্বজনদের হারান তিনি।
তিন সন্তান হারানোর প্রায় দশ মাস পর ফাতিমা আবার অন্তঃসত্ত্বা হন। ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল জন্ম নেয় জাইদ। যুদ্ধের মধ্যে এই জন্মকে পরিবারের সবাই দেখেছিল ক্ষুদ্র এক আশার আলো হিসেবে। স্বজনরা জাইদের নাম মৃত ভাইদের নামে রাখতে চাইলেও ফাতিমা রাজি হননি। চেয়েছিলেন সন্তানের নিজস্ব পরিচয় থাকুক। ধীরে ধীরে জাইদ হয়ে ওঠে পুরো পরিবারের নয়নের মণি। বিশেষ করে বোনেরা তাকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে চাইত না।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে ফাতিমাদের বাড়ি আংশিক পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই বাড়িও আবার গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। হামলার কয়েক মিনিট আগে গরমে ঘুম ভেঙে ফাতিমা অন্য জায়গায় সরে যান। জাইদকে জানালার পাশে রেখে যান, যাতে সে একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারে। সেই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত তার জীবন কেড়ে নেয়।
হামলায় বড় মেয়ে বারা সামান্য আঘাত পেলেও ছোট মেয়ে লিনা মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছে। সে এখনো হাসপাতালে। মায়ের কাছে প্রথম কথা জিজ্ঞেস করেছে ভাইয়ের খবর। ফাতিমা সাহস পাননি সত্য বলতে। বলেছেন, জাইদ ভালো আছে, অপেক্ষা করছে। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর কীভাবে সত্যিটা জানাবেন, তা তিনি এখনো জানেন না।
ফাতিমা বলেন, জাইদ কখনোই স্বাভাবিক শৈশব পায়নি। যেদিন সে মারা গেল, সেদিন বিকেলে সে খুব ছটফট করছিল, বাইরে যেতে চাইছিল। কিন্তু শিশুদের খেলার কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই। সে সারা জীবন ঘরের ভেতরেই কাটিয়েছে।
গতই বছর ধরে চলা সংঘাতের পর গত বছর যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও ইসরায়েল প্রায় প্রতিদিনই গাজায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। চুক্তির পর থেকে গত দশ মাসে অন্তত ১ হাজার ২০০ জন নিহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে মোট নিহতের সংখ্যা ৭৩ হাজার ছাড়িয়েছে। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে গাজায় অন্তত ২৬০ শিশু নিহত হয়েছে। সংস্থার মুখপাত্র জেমস এল্ডার একে যুদ্ধবিরতির নিষ্ঠুর ও প্রাণঘাতী অলীক মায়াজাল বলে অভিহিত করেছেন।
ফাতিমা বিশ্বাস করেন, ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে নারী ও শিশুদের নিশানা বানাচ্ছে। তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আমরা যে হতাহতের দৃশ্য দেখছি, তার বড় অংশই নারী ও শিশু। তাদের কোনো অজুহাতের প্রয়োজন হয় না।
জাইদের মৃত্যুর সেই একই দিনে আল-মাওয়াসিতে মামার তাঁবুতে হামলায় নিহত হয় নয় বছর বয়সী রতিল আল-আবদাল্লাহ। দুদিন আগে মা ও ভাইবোনদের সঙ্গে মামার বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল সে। বাবা আবদুল্লাহ মেয়ের নিথর দেহ জড়িয়ে প্রশ্ন করেন, এমন ভাগ্যের জন্য তার নিষ্পাপ শিশুটি কী অপরাধ করেছিল?
জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন জানিয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনী ফিলিস্তিনি শিশুদের ওপর জেনেশুনে হামলা চালাচ্ছে। কিন্তু কোনো প্রতিবেদন বা পরিসংখ্যানই ফাতিমার হারানো চার সন্তানকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না। হাসপাতালে আহত মেয়ের পাশে বসে তিনি এখন নতুন এক লড়াইয়ের মুখোমুখি। মাথা গোঁজার ঠাঁই খোঁজা এবং মেয়েকে সেই সত্যিটা জানানো যে, তার আদরের ছোট ভাই আর কখনো ফিরবে না।
ফাতিমা কান্না করে বলেন, আমার বুকের ভেতর তুষের আগুন জ্বলছে। কে এই আগুন নেভাবে, তা আমি জানি না।