চলন্ত ট্রেনে পাথর: উদাসীনতারও বিচার প্রয়োজন

বাংলাদেশে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ একটি নিত্য ঘটনা। ইহা এতই পুরাতন যে, আমরা ইহাকে প্রায় স্বাভাবিক বলিয়া মানিয়া লইয়াছি। সংবাদপত্রে খবর ছাপা হয়, কয়েক দিন আলোচনা চলে, তাহার পর আবার নীরবতা; কিন্তু যাহার চোখ নষ্ট হয়, যাহার মুখের হাড় ভাঙে, যাহার পরিবার চিকিৎসার ব্যয় বহন করিতে গিয়া নিঃস্ব হয়, তাহার নিকট ইহা কোনো সংবাদ নহে-ইহা সমগ্র জীবনের দণ্ড। বহু বৎসর ধরিয়া এই অপরাধ চলিতেছে। আইন আছে, বৈঠক আছে, প্রচার আছে। কেবল অপরাধের অবসান নাই। আমরা যখন একটি পুনরাবৃত্ত অপরাধকে ব্যতিক্রম বলিয়া দেখিতে থাকি, তখন অপরাধও ধীরে ধীরে নিয়মে পরিণত হয়। গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদন আমাদের ইহাই স্মরণ করাইয়া দেয়।

সম্প্রতি সিরাজগঞ্জে দ্রুতযান এক্সপ্রেসে যাত্রাকালে তরুণ শিক্ষার্থী সাব্বির হোসেনের ডান চোখে একটি পাথর আঘাত করিয়াছে। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, তিনি হয়তো আর সেই চোখে দেখিতে পারিবেন না। মুখের হাড় ভাঙিয়াছে, অস্ত্রোপচারের জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন। সাম্প্রতিক মাসগুলিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে একইভাবে চিকিৎসক, আইনজীবী, শিশু, রেলকর্মী ও সাধারণ যাত্রীরা আহত হইয়াছেন। অর্থাৎ আমরা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনার মুখোমুখি নহি। বরং দীর্ঘদিনের একটি নীরব সহিংসতা নিত্যদিন মোকাবিলা করিতেছি। রেলওয়ে পুলিশের বক্তব্য হইল, অধিকাংশ ঘটনায় জড়িত স্কুলপড়ুয়া শিশু-কিশোর। তবে এই তথ্য স্বস্তির নহে, বরং ইহা অধিকতর উদ্বেগের। কারণ, শিশুর হাতে পাথর থাকিলে দায় কেবল শিশুর নহে। একটি শিশু জন্মগতভাবে জানে না, কোন কাজ অপরাধ, কোনটি খেলা। সেই শিক্ষা সে পরিবার হইতে পায়, বিদ্যালয় হইতে পায়, সমাজ হইতে পায়। যদি সে চলন্ত ট্রেন লক্ষ্য করিয়া পাথর নিক্ষেপে আনন্দ খুঁজিয়া পায়, তাহা হইলে বুঝিতে হইবে-আমাদের শিক্ষার কোথাও একটি গভীর শূন্যতা সৃষ্টি হইয়াছে। এই কারণেই কেবল শিশুদের দোষারোপ করিলে দায়িত্ব শেষ হয় না। অভিভাবকদের ভূমিকাও প্রশ্নের সম্মুখীন। রেলওয়ে পুলিশ পুনরাবৃত্ত ঘটনার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা বিবেচনার কথা বলিয়াছে। বিষয়টি কঠোর বলিয়া মনে হইতে পারে; কিন্তু সম্পূর্ণ অযৌক্তিক নহে। পরিবার যদি সন্তানের আচরণের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন থাকে, তাহা হইলে সেই উদাসীনতারও একটি সামাজিক মূল্য থাকা উচিত। তবে সতর্কতা এই যে, দায় কেবল পরিবারের উপর চাপাইয়া রাষ্ট্র নিজের দায়িত্ব হইতে অব্যাহতি পাইতে পারে না।

রেলওয়ে আইনে এই অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রহিয়াছে-এমনকি মৃত্যুর ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত; কিন্তু আইনের কঠোরতা তখনই অর্থবহ, যখন তাহার প্রয়োগ নিশ্চিত হয়। দীর্ঘদিন ধরিয়া এই অপরাধ চলিলেও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের সংখ্যা কার্যত অনুপস্থিত। ফলে অপরাধীরা বুঝিয়া গিয়াছে, ধরা পড়িবার সম্ভাবনা যেমন কম, শাস্তি হইবার সম্ভাবনাও তেমনি ক্ষীণ। আরও বিস্ময়ের বিষয়, এত ঘটনার পরও চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের কোনো পূর্ণাঙ্গ জাতীয় তথ্যভান্ডার নাই। কত জন আহত, কত জন নিহত, কোন কোন এলাকা অধিক ঝুঁকিপূর্ণ-ইহার নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান রাষ্ট্রের নিকটই অনুপস্থিত। যে সমস্যার সঠিক পরিমাণ জানা যায় না, তাহার কার্যকর সমাধানও সাধারণত হয় না। প্রশাসনের এই তথ্যগত দুর্বলতা নীতিনির্ধারণকেও দুর্বল করিয়া দেয়।

অতএব, প্রয়োজন কেবল প্রচারপত্র বা সচেতনতামূলক সভা নহে। পাথর নিক্ষেপপ্রবণ এলাকাগুলিকে যথাযথভাবে চিহ্নিত করিতে হইবে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বৃদ্ধি করিতে হইবে। স্থানীয় প্রশাসন, বিদ্যালয়, জনপ্রতিনিধি ও সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করিতে হইবে। ইহার পাশাপাশি প্রতিটি ঘটনার দ্রুত তদন্ত, অপরাধী শনাক্তকরণ এবং দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত না হইলে এই প্রবণতা থামিবে না। একজন যাত্রী টিকিট ক্রয় করেন নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাইবার জন্য, অজ্ঞাত কোনো ব্যক্তির নিক্ষিপ্ত পাথরের মুখোমুখি হইবার জন্য নহে। অতএব, চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপকে আর দুষ্টুমি, কিশোরসুলভ উচ্ছ্বাস কিংবা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলিবার সুযোগ নাই। ইহা একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ।