জুলাই গণঅভ্যুত্থান

একদিন এগিয়ে আনা হয় ‘লং মার্চ টু ঢাকা’

আজ ৪ আগষ্ট। জুলাই আন্দোলনের হিসেবে এই দিনটিকে ‘৩৫ জুলাই’ বলা হয়। ২০২৪ সালের এই দিনে প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে মাঠে নামে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ঘোষণা আসে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রাক্কালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের দেওয়া এই ঘোষণা দেশজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।

‘পরশু নয়, আগামীকালই লং মার্চ টু ঢাকা!’—মাত্র সাতটি শব্দ। কিন্তু এই সাত শব্দের আহ্বানই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় মোড় তৈরি করেছিল। সংঘর্ষে পুরো দেশ যেন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। প্রাণ হারান শতাধিক মানুষ। চলমান আন্দোলনকে ‘জঙ্গি হামলা’ বলে আখ্যায়িত করে তৎকালীন সরকার। কিন্তু এতে আন্দোলনকারীরা পিছু হটেননি। 

মূলত ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছিলেন আন্দোলনের সমন্বয়কেরা। তবে ৪ আগস্ট দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও সরকারি বাহিনীর গুলিতে বহু ছাত্র-জনতা নিহত হওয়ার পর আন্দোলনের নেতৃত্ব কর্মসূচির তারিখ একদিন এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়।

এরপর সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় জানান, পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ৬ আগস্টের পরিবর্তে ৫ আগস্ট অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে তিনি সারাদেশের ছাত্র-জনতাকে পরদিনই ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আহ্বান জানান।

বার্তায় আসিফ মাহমুদ বলেছিলেন, আমাদের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ৬ আগস্ট থেকে পরিবর্তন করে ৫ আগস্ট করা হলো। অর্থাৎ আগামীকালই সারাদেশের ছাত্র-জনতাকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করার আহ্বান জানাচ্ছি।

তিনি আরও বলেছিলেন, আজ প্রায় অর্ধশতাধিক ছাত্র-জনতাকে খুন করেছে খুনি হাসিনা। চূড়ান্ত জবাব দেওয়ার সময় এসে গেছে। বিশেষ করে আশপাশের জেলাগুলো থেকে সর্বোচ্চ উপস্থিতি নিয়ে সবাই ঢাকায় আসবেন এবং যারা পারবেন আজই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান। ঢাকায় এসে মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা রাজপথগুলোতে অবস্থান নিন।

আরেক বক্তব্যে তিনি বলেন, চূড়ান্ত লড়াই, এই ছাত্র-নাগরিক অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত স্বাক্ষর রাখার সময় এসে গেছে। ইতিহাসের অংশ হতে ঢাকায় আসুন সকলে। যে যেভাবে পারেন কালকের মধ্যে ঢাকায় চলে আসুন। ছাত্র-জনতা এক নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটাবো।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালাতে দেখা যায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত অভিযানে ৪ আগস্ট নিহত হন শতাধিক মানুষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করে এবং তিন দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে।

সেদিন প্রথমে ৬ আগস্ট ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ৫ আগস্টের জন্য রাখা হয় তুলনামূলক কম কর্মসূচি। তবে সমন্বয়করা পরে জানান, ৫ আগস্ট বড় কর্মসূচি না থাকায় সরকার ওই দিনই আন্দোলন দমনে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। 

তাদের দাবি, একদিন সময় পেলে সরকার ৫ আগস্ট বড় ধরনের হত্যাযজ্ঞ চালাতে পারত। বিভিন্ন সূত্র থেকে এমন তথ্য পাওয়ার পর কর্মসূচির সময় পরিবর্তনের বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়।
 
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আব্দুল কাদের বলেন, ‘আসিফ ভাই যখন ৬ তারিখের কর্মসূচি ঘোষণা করলেন, তখন আমি একটি বাসায় ছিলাম। সেখানে দুজন ব্যক্তি এসে বলেন, যদি আমরা সরকারকে একদিন সময় দিই, তাহলে শেখ হাসিনা নিজেকে আরও গুছিয়ে নেয়ার সুযোগ পাবে।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আরেক সাবেক সমন্বয়ক মাহিন সরকার বলেন, ‘হাসিনার সব পেটোয়া বাহিনীকে ঢাকায় আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। 

আমরা যদি কর্মসূচি এগিয়ে না আনতাম, তাহলে ঢাকা শহরে বড় ধরনের হত্যাযজ্ঞ চালানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে পারত।’
 
এরপর ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন সমন্বয়করা। রাজনৈতিক দলগুলোও ততক্ষণে আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানায়। সবার সম্মতিতে সিদ্ধান্ত হয়, ৬ আগস্ট নয়, ৫ আগস্টই পালিত হবে চূড়ান্ত কর্মসূচি ‘লং মার্চ টু ঢাকা’।
 
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির বলেন, ‘বিভিন্ন পক্ষ থেকে ৬ আগস্টের কর্মসূচি ৫ আগস্টে আনার প্রস্তাব আসে। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। 

পরে আমরা দলের তৎকালীন চেয়ারম্যানকে জানাই। তিনি বলেন, মহাসচিবের সঙ্গে তার কথা হয়েছে এবং আমাদের পক্ষ থেকেও কর্মসূচি এগিয়ে আনার বিষয়ে জানাতে বলেন।’
 
ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগাহ বলেন, ‘প্রথমে ৬ আগস্ট কর্মসূচি দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে আমাদের বক্তব্য ছিল, মানুষ এর মধ্যেই রাজপথে নেমে এসেছে।  তখন কিছুটা সংশয় ছিল, এত দ্রুত মানুষকে আবার নামানো যাবে কি না। আমরা বলেছিলাম, সবাই সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামবে। এরপর সবাই আত্মবিশ্বাস পায় এবং ৫ আগস্ট কর্মসূচি ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয়।’
 
ইতিহাসের সেই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। ভিডিও বার্তায় তিনি জানান, ‘৬ আগস্টের যে লং মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি ছিল, সেটি আমরা একদিন এগিয়ে এনেছি।’
 
এ বিষয়ে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ পতনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল এই সিদ্ধান্ত। তখন ঝুঁকি নেয়ার সুযোগ ছিল না। একবার ব্যর্থ হলে আর ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকত না। হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করার প্ল্যান ছিল। আমাদেরও হয়তো হত্যা করা হতো। তাই আগের কর্মসূচি ঘোষণার দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যেই সেটি পরিবর্তন করে একদিন এগিয়ে আনি।’
 
পরশু নয়, আগামীকালই ‘লং মার্চ টু ঢাকা’। ৪ আগস্টের সেই একটি ঘোষণাই ৫ আগস্ট ঢাকার সব রাজপথকে নিয়ে যায় গণভবনের অভিমুখে। আর তারই পরিণতিতে পতন ঘটে ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের।

পরে সমন্বয়ক সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়াসহ আন্দোলনের অন্য নেতারাও ‘পরশু নয়, কালকেই লং মার্চ টু ঢাকা’ বার্তাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন এবং ভিডিও বার্তার মাধ্যমে একই আহ্বান জানান।

পরে ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের সেই একটি ঘোষণাই ৫ আগস্ট ঢাকার সব রাজপথকে নিয়ে যায় গণভবনের অভিমুখে। আর তারই পরিণতিতে পতন ঘটে ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের।

এদিকে সেই দিনের কথা স্মরণ করে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন আসিফ মাহমুদ। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দেওয়া পোস্টে তিনি লেখেন, ‘পরশু নয়, আগামীকালই লং মার্চ টু ঢাকা’।