জুলাই গণঅভ্যুত্থান

শেখ হাসিনার পদত্যাগের আগের ৪৮ ঘণ্টা

শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার আগের রাতে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে বিক্ষোভকারীদের ওপর সেনাবাহিনী গুলি চালাবে না—এমন সিদ্ধান্ত হয় বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এ তথ্যের সূত্র হিসেবে ঘটনার বিষয়ে অবগত দুই সেনা কর্মকর্তার বরাত উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বৈঠকের পর সেনাপ্রধান গণভবনে গিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক ভারতীয় কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, সেনাপ্রধান তখন শেখ হাসিনাকে জানান যে সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী সেনাবাহিনী কারফিউ ও লকডাউন বাস্তবায়নে আগ্রহী নয়। এর মাধ্যমে সরকারের প্রতি সেনাবাহিনীর সমর্থন কার্যত প্রত্যাহারের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

রয়টার্স জানিয়েছে, ঘটনাপ্রবাহ পুনর্গঠনের জন্য তারা মোট ১০ জনের সঙ্গে কথা বলেছে। এর মধ্যে চারজন বর্তমান সেনা কর্মকর্তা এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজন ব্যক্তি রয়েছেন। নিরাপত্তাজনিত কারণে তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বৈবাহিক সূত্রে শেখ হাসিনার আত্মীয় হলেও সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান পদত্যাগের আগের শনিবার থেকেই অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেন। সেদিন কয়েকশ সেনা কর্মকর্তার উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি মানুষের জীবন রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে এবং ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি মোকাবিলার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে সেনাবাহিনী বিক্ষোভ দমনে শক্তি প্রয়োগ করবে না—এমন বার্তাও উঠে আসে।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সেনাপ্রধান প্রকাশ্যে সরকারের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহারের ঘোষণা না দিলেও বিক্ষোভে অন্তত ২৪১ জন নিহত হওয়ার পর শেখ হাসিনাকে সমর্থন অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়ে বলে তিন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মত দিয়েছেন।

অনির্দিষ্টকালের কারফিউ জারির পরও সোমবার ঢাকায় বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সমাবেশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। রয়টার্সের বরাত অনুযায়ী, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় ৭৬ বছর বয়সী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা আলোচনার পর একসঙ্গে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর পরে দেশটির পার্লামেন্টে জানান, বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকট শুরুর পর থেকেই দিল্লি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছিল। তিনি বলেন, নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকের পর শেখ হাসিনা পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই ভারতে প্রবেশের অনুমতি চান।

রয়টার্সের বরাত দিয়ে আরও বলা হয়, ভারতের এক কর্মকর্তা শেখ হাসিনাকে কূটনৈতিকভাবে জানিয়ে দেন যে ভারতে তার অবস্থান সাময়িক হওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত না হয়। এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাওয়া ড. মুহাম্মদ ইউনূস সে সময় ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ‘ভুল লোকজনের’ ওপর নির্ভর করেছে এবং দিল্লির উচিত তাদের বৈদেশিক নীতি পুনর্বিবেচনা করা।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার দুপুরের দিকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি সি-১৩০ উড়োজাহাজে করে শেখ হাসিনা ভারতের দিল্লির কাছে হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে পৌঁছান। সেখানে তিনি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

গত তিন দশকের মধ্যে প্রায় ২০ বছর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন শেখ হাসিনা। তার টানা প্রায় দেড় দশকের শাসনামলে বিরোধী মত দমন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুমসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা অভিযোগ ওঠে। ২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনে বিরোধীদের বর্জনের মধ্যে আওয়ামী লীগ টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আসে।