এআইয়ের সাহায্যে ১৬টি নতুন ভাইরাস তৈরি, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় প্রথমবারের মতো নতুন ধরনের ভাইরাস তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষকদের মতে, এ অর্জন চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিলেও প্রযুক্তিটির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, গবেষণায় তৈরি করা ভাইরাসগুলো ব্যাকটেরিওফাজ বা ফাজ, যা শুধুমাত্র ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করে। এসব ভাইরাস মানুষ বা অন্য প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর নয়। বর্তমানে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফাজ থেরাপি ব্যবহার করা হচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, এআইয়ের নকশায় তৈরি কয়েকটি ফাজ একসঙ্গে ব্যবহার করলে এমন ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়াও ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে, যেগুলো প্রাকৃতিক ফাজের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করেছিল।

এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাসায়নিক প্রকৌশলী ড. ব্রায়ান হাই। তার দল ‘জিনোম ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ নামে এক ধরনের এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করেন, যা মূলত মানুষের ব্যবহৃত বড় ভাষা মডেলের সংস্করণ। এই প্রযুক্তির সাহায্যে তারা নতুন ফাজের জিনোম বা জিনগত নকশা তৈরি করেন।

এরপর সেই নকশা ব্যবহার করে পরীক্ষাগারে সত্যিকারের ফাজ তৈরি করা হয় এবং ব্যাকটেরিয়ার ওপর পরীক্ষা চালানো হয়।

গবেষকদের ধারণা, ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে দ্রুত নতুন ফাজ তৈরি করা সম্ভব হলে জটিল ও অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণের চিকিৎসায় বড় অগ্রগতি আসতে পারে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বৈজ্ঞানিক সাময়িকী সায়েন্স-এ।

তবে এ সাফল্যের পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়েও সতর্ক করেছেন গবেষকরা। তাদের মতে, এ ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার কঠোর তদারকির আওতায় রাখতে হবে এবং গবেষণার প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করা জরুরি।

একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক টম ইংলেসবি ও মরিটজ হ্যাঙ্কে। তাদের ভাষ্য, এআই এখন ভাইরাসের জিনোম ডিজাইন করতে সক্ষম হলেও, এ প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি।

গবেষণায় ‘ইভিও১’ ও ‘ইভিও২’ নামে দুটি এআই মডেল ব্যবহার করা হয়। এগুলোকে প্রায় ২০ লাখ ব্যাকটেরিওফাজের জিনগত তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। গবেষকরা ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষ, প্রাণী বা উদ্ভিদে রোগ সৃষ্টি করতে পারে—এমন ভাইরাসের তথ্য এই মডেলে অন্তর্ভুক্ত করেননি, যাতে অপব্যবহারের ঝুঁকি কম থাকে।

এআই কয়েক হাজার সম্ভাব্য জিনোম তৈরি করলেও সেখান থেকে প্রায় ৩০০টি পরীক্ষাগারে তৈরি করা হয়। শেষ পর্যন্ত মাত্র ১৬টি ফাজ কার্যকর প্রমাণিত হয়। তবে এই ১৬টি একত্রে ব্যবহার করে ই. কোলাইয়ের দুটি কঠিন ধরনের ব্যাকটেরিয়া সফলভাবে ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে।

বিজ্ঞানীদের ভাষ্য, এই গবেষণা প্রমাণ করেছে যে এআই জীববৈজ্ঞানিক নকশা তৈরিতে কার্যকর হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, এখনই এআই দিয়ে সহজে মানুষের জন্য ক্ষতিকর যেকোনো ভাইরাস তৈরি করা সম্ভব। কারণ ব্যাকটেরিওফাজের জিনোম তুলনামূলকভাবে ছোট ও সরল, যেখানে মানুষ বা প্রাণীতে রোগ সৃষ্টি করা ভাইরাসের জিনগত কাঠামো অনেক বেশি জটিল।

যুক্তরাজ্যের ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক টম এলিস সতর্ক করে বলেন, বিপজ্জনক রোগজীবাণুর তথ্য দিয়ে এআইকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে জিনগত তথ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং সংবেদনশীল জিনোম তৈরির ওপর কার্যকর নজরদারি থাকলে সেই ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষক ড. ফিলিপা লেনজোসও মনে করেন, শুধু এআই নিয়ন্ত্রণ করলেই যথেষ্ট নয়। পরীক্ষাগারে ডিএনএ সংশ্লেষণ, গবেষণা পরিচালনা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার—সব ক্ষেত্রেই কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

গবেষকদের মতে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে এআই নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে। তবে এই প্রযুক্তি যেন মানবকল্যাণে ব্যবহৃত হয় এবং কোনোভাবেই নতুন ঝুঁকির কারণ না হয়ে ওঠে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।