চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস

রেফারিদের ‘সেক্সুয়াল সার্ভিস’ দিয়ে নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা!

বিদেশি রেফারিদের সিদ্ধান্ত নিজেদের পক্ষে আনতে ২০১১ ও ২০১২ সালে তাদের জন্য যৌনসেবার ব্যবস্থা করার অভিযোগে নতুন করে চাপে পড়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোরিয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (কেএফএ)। দক্ষিণ কোরিয়ার সম্প্রচারমাধ্যম জেটিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ২০১৬ সালের গোপন নিরীক্ষা নথিতে এ অভিযোগের তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে কেএফএর এক সাবেক কর্মকর্তা বলেছেন, সংস্থাটি চেয়েছিল রেফারিরা যেন ‘আমাদের পক্ষে বাঁশি বাজান’। ইয়োনহাপ সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ওই ম্যাচগুলোতে দায়িত্বে থাকা রেফারিরা জাপান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরান, বাহরাইন ও উজবেকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের ছিলেন।

জাতীয় দলের কোচ নিয়োগে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ নিয়েও কেএফএ আগে থেকেই পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার বিদায়ের পর জাতীয় দলের কোচ নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। এর ধারাবাহিকতায় জুলাই ২০২৪-এ পুরুষ জাতীয় দলের প্রধান কোচ হিসেবে হং মিয়ুং-বোকে নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করতে বৃহস্পতিবার কেএফএর সদরদপ্তরে অভিযান চালায় পুলিশ। সাম্প্রতিক ওই টুর্নামেন্টে দক্ষিণ কোরিয়া বিদায় নেওয়ার পর হং মিয়ুং-বো পদত্যাগ করেন।

জেটিবিসির প্রতিবেদনের জবাবে কেএফএর এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘১৫ বছর আগে কিছু অস্বস্তিকর ঘটনা ঘটে থাকতে পারে, তবে এখন আমরা কঠোরভাবে নৈতিকতা নির্দেশিকা মেনে চলি।’ তিনি আরও বলেন, কেএফএ কেবল পাঁচ বছর পর্যন্ত নথি সংরক্ষণ করে, ফলে অভিযোগে উল্লিখিত ঘটনাগুলোর বিস্তারিত তারা যাচাই করতে পারছে না।

জেটিবিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ওই নিরীক্ষায় দেখা যায়, ২০১১ সালের মার্চ থেকে ২০১২ সালের মার্চের মধ্যে সাত দফায় মোট ২০ জন ম্যাচ কর্মকর্তার জন্য আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেছিলেন কেএফএর কর্মকর্তারা। এর মধ্যে ছিল ২০১৪ ফিফা বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের একটি ম্যাচ এবং ২০১২ লন্ডন অলিম্পিক বাছাইয়ের দুটি ম্যাচ। করপোরেট ক্রেডিট কার্ড ব্যক্তিগত খরচে ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে প্রথমে এই নিরীক্ষা শুরু হয়েছিল। তদন্তকারীরা পরে দেখেন, বিদেশি রেফারিরা ওই ব্যয়ের সুবিধাভোগী ছিলেন। এরপর আর কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে মন্ত্রণালয় বিষয়টি বন্ধ করে দেয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগের একটি ঘটনা ২০১২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি, সিউলে ২০১৪ বিশ্বকাপ এশীয় বাছাইপর্বে দক্ষিণ কোরিয়ার ২-০ গোলে কুয়েতকে হারানোর ম্যাচের আগে ঘটে বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়। তাতে বলা হয়, ম্যাচটিতে দায়িত্ব পাওয়া দুই রেফারির জন্য সিউলের অভিজাত গ্যাংনাম এলাকার একটি ম্যাসাজ পার্লারে কেএফএ করপোরেট কার্ড দিয়ে ৫ লাখ ওন পরিশোধ করে। ২০১৬ সালে মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, ওই অর্থের মধ্যে যৌনসেবার মূল্যও অন্তর্ভুক্ত ছিল। সে সময় অনেক ম্যাসাজ পার্লারে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে অবৈধ যৌনসেবা দেওয়ার অভিযোগ ছিল।

কেএফএর রেফারি ব্যুরোর সাবেক এক কর্মী, যিনি জেটিবিসিতে ‘মিস্টার বি’ নামে পরিচিত, দাবি করেন তিনিই ওই অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিলেন। মুখ আড়াল করে ও কণ্ঠ পরিবর্তন করে প্রচারিত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ম্যাসাজের খরচের মধ্যেই যৌনসেবার খরচ ছিল। বিদেশি রেফারিরাই আগে এটি চেয়েছিলেন।’ তার ভাষ্য, দীর্ঘ ফ্লাইটে এসে রেফারিরা অস্বস্তির কথা বলতেন। ‘তারা বলত, “অনেক দীর্ঘ ফ্লাইটে এসেছি, ভালো লাগছে না।” আমরা তাদের খুশি রাখার চেষ্টা করতাম। তাহলে কি তারা আমাদের পক্ষে বাঁশি বাজাতেন না?’

তবে জেটিবিসির প্রতিবেদন স্বাধীনভাবে যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া যায়নি, ঠিক কোন রেফারিরা ওই যৌনসেবা পেয়েছিলেন। মিস্টার বি আরও দাবি করেছেন, এ ধরনের চর্চা দক্ষিণ কোরিয়ার চেয়ে অন্য দেশগুলোতে আরও বেশি ছিল, যদিও এ বিষয়ে তিনি কোনো বিস্তারিত দেননি।

কেএফএর আরেক সাবেক কর্মী, পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ‘দিস উইক ইন এশিয়া’কে বলেন, বিদেশি রেফারিরা অনেক সময় ম্যাচের বেশ আগেই এসে পৌঁছাতেন। তার ভাষ্য, ‘তাদের হাতে অনেক ফাঁকা সময় থাকত। তারা ঘুরতে বা কেনাকাটা করতে চাইতেন। আমরা তাদের চাহিদা পূরণ করতে বাধ্য বোধ করতাম।’ একইসঙ্গে তিনি বলেন, ঘটনাগুলো অনেক আগের এবং সে সময় প্রসিকিউটররা মামলা এগোয়নি। এখন জেটিবিসি কেন এটি প্রকাশ করল, তা তিনি বুঝতে পারছেন না।

নিরীক্ষায় ২০১১ সালের ২২ সেপ্টেম্বরের আরেকটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেদিন ২০১২ লন্ডন অলিম্পিকের বাছাইপর্বে ওমানের বিপক্ষে দক্ষিণ কোরিয়ার শেষ ম্যাচের পর চ্যাংওনের একটি ম্যাসাজ পার্লারে কেএফএর করপোরেট কার্ড ব্যবহার করে ৭ লাখ ৬০ হাজার ওন পরিশোধ করা হয় বলে অভিযোগ। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত ছিল, ওই অর্থ ম্যাচে দায়িত্ব পালন করা চার রেফারির জন্য যৌনসেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যয় করা হয়েছিল। সেই ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়া ২-০ ব্যবধানে জিতেছিল।

আরেক ঘটনায়, ২০১২ সালের ১৪ মার্চ সিউলের গ্যাংনামের একটি ম্যাসাজ পার্লারে কেএফএর করপোরেট কার্ডে ১ লাখ ৯৮ হাজার ওন খরচের তথ্য পাওয়া যায়। ওই দিন কাতারের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার ০-০ ড্র হওয়া অলিম্পিক বাছাই ম্যাচ চলাকালে এক রেফারি সুপারভাইজারের জন্য যৌনসেবা দেওয়া হয়েছিল বলে মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।

ঘटनাগুলো এক দশকেরও বেশি আগের হলেও, ফুটবল নৈতিকতা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেফারিকে প্রভাবিত করার যেকোনো চেষ্টা ফিফার শৃঙ্খলাবিধির গুরুতর লঙ্ঘন। ম্যাচ প্রভাবিত করা ও দুর্নীতি ফুটবলে সবচেয়ে গুরুতর নৈতিক অপরাধগুলোর মধ্যে পড়ে।

২০১২ লন্ডন অলিম্পিকে পুরুষ ফুটবে জাপানকে ২-০ গোলে হারিয়ে ব্রোঞ্জ জিতেছিল দক্ষিণ কোরিয়া। তবে নতুন এই অভিযোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় বিতর্ক তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন দেশটির ফুটবল বিশ্লেষক পার্ক মুন-সিয়ং। ইউটিউবে নিজের চ্যানেলে তিনি বলেন, ‘এই কেলেঙ্কারি আন্তর্জাতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। রেফারিদের প্রভাবিত করার চেষ্টা একটি গুরুতর অপরাধ।’

কেএফএ এখন একই সঙ্গে দুই ধরনের চাপের মুখে—একদিকে জাতীয় দলের কোচ নিয়োগে অনিয়মের তদন্ত, অন্যদিকে ২০১১-১২ সময়ের এই গুরুতর নৈতিক অভিযোগ। জেটিবিসির প্রতিবেদনের পর পুরনো নিরীক্ষা নথি ও তৎকালীন সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়া নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।