উপেক্ষার দেওয়াল ভেঙে ট্রফির মহাসমুদ্রে ভাজিনহা

ফুটবল যখন নিছক পরিসংখ্যান, কোটি টাকার পিআর এজেন্সি আর করপোরেট হিসাব-নিকাশে বন্দি, ঠিক তখনই কিছু গল্প এসে আমাদের মনে করিয়ে দেয়, খেলাটা এখনো অবিনশ্বর সুন্দর। গত জুনে বিশ্বকাপে পা রাখার আগে জোসিমার ডায়াসকে কয়জনই বা চিনত? অথচ ২০২৬ বিশ্বকাপের ঠিক পর, চিলির সান্তিয়াগো বিমানবন্দর যখন হাজারো উন্মাতাল সমর্থকের ড্রামের আওয়াজ আর গগনবিদারি স্লোগানে কাঁপছিল, তখন দৃশ্যপট আলাদা। 

পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগের অখ্যাত দল শাভেস থেকে চুক্তি শেষ করে তিনি যখন লাতিন আমেরিকার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ক্লাব কোলো কোলো-তে যোগ দিতে পা রাখলেন, তখন সান্তিয়াগো যেন এক নতুন রাজপুত্রকে বরণ করে নিচ্ছিল। আর কেউ নন, তিনি কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী 'বুড়ো' বাজপাখি ভোজিনহা। ২৫ বছর বয়সে দেরিতে পেশাদার ফুটবল শুরু করা, অ্যাঙ্গোলা, মলদোভা, সাইপ্রাস আর স্লোভাকিয়ার মতো অখ্যাত লিগে বছরের পর বছর পড়ে থাকা এই মানুষটি আজ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন।

বিশ্বকাপ শুরুর আগে কোনো ফুটবল পণ্ডিত তাদের 'সেরা দশ' তো দূর, সেরা পঞ্চাশেও এই গোলরক্ষকের নাম রাখার প্রয়োজন মনে করেননি। শুধু তাকেই বা কেন, আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে মাত্র সাড়ে ৫ লাখ মানুষের ছোট্ট এক দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দেকে কয়জনই বা ফুটবল মানচিত্রে গুনত? অনগ্রসর এই দলটিকে নিয়ে বাজি ধরার মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া দায় ছিল। কিন্তু মাঠের খেলায় সব হিসাবনিকাশ উলটে দিয়েছে তারা। আর এই অবিশ্বাস্য যাত্রার নেপথ্যে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ভোজিনহা। পোস্টের নিচে তার একেকটি অবিশ্বাস্য সেভ আর ঠান্ডা মাথার নেতৃত্ব কেপ ভার্দেকে এনে দিয়েছে বিশ্বমঞ্চের সমীহ। যে ফুটবল পণ্ডিতরা তাকে গণনায় ধরেননি, আজ তারাই তাকে 'মহাতারকা' উপাধিতে ভূষিত করছেন।

বিশ্বকাপের এই অবিশ্বাস্য বীরত্বের পর ভোজিনহা আর তার পুরোনো ক্লাবে ফিরে যাননি। ইন্টার মায়ামির মতো গ্ল্যামারাস কোনো ক্লাবের প্রস্তাব কিংবা কাড়ি কাড়ি টাকার মোহ উপেক্ষা করে তিনি বেছে নেন লাতিন আমেরিকার খাঁটি ফুটবলীয় উন্মাদনা। ৩৪ বারের চিলিয়ান চ্যাম্পিয়ন কোলো কোলো-তে তার এই আগমন ছিল রূপকথার মতো। ক্লাবটির বিখ্যাত 'মনুমেন্টাল স্টেডিয়াম'-এ যখন তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তখনই সেখানে মঞ্চস্থ হলো এমন এক দৃশ্য, যা সচরাচর চোখে পড়ে না। চিলির এই জায়ান্ট ক্লাবের গৌরবময় ইতিহাসের অর্জিত সমস্ত ট্রফি এনে সাজানো হয়েছিল মাঠের সবুজ গালিচায়। 

সেই ট্রফির মহাসমুদ্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে খোদ ভোজিনহাও বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যান। তিনি নিজেও হয়তো ভাবেননি, ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে এসে লাতিন আমেরিকার একটি ঐতিহাসিক ক্লাব তাকে এভাবে রাজকীয় মর্যাদায় বরণ করে নেবে। এমনকি চিলির ফুটবল ফেডারেশন তাদের কঠোর নিয়ম ভেঙে শুধু এই তারকার জন্য জার্সিতে ডাকনাম লেখার বিশেষ অনুমতি দিয়েছে, যেন সান্তিয়াগোর গ্যালারি চিৎকার করে ডাকতে পারে, ভোজিনহা (পর্তুগিজ ভাষায় যার অর্থ 'ছোট দাদি')।