এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের বিশ্লেষণ  

উভয় সংকটে ট্রাম্প, ওয়াশিংটনের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। এই সপ্তাহে একদিকে তীব্র হুঁশিয়ারি, অন্যদিকে তোড়জোড় কূটনৈতিক তৎপরতা সব মিলিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এখন চরম কোণঠাসা অবস্থায় ফেলেছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ করে ফেলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু করা এই যুদ্ধ থেকে এখন বেরোনোর কোনো সহজ পথ খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি।

বর্তমানে তার সামনে মূলত দুটো কঠিন পথ। এক, ওমান ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য মধ্যবর্তী চুক্তি মেনে নেওয়া। এতে হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরান এমন নিয়ন্ত্রণ পাবে, যা যুদ্ধ শুরুর আগে তাদের ছিল না। দুই, যুদ্ধের তীব্রতা বাড়িয়ে নতুন করে কঠোর সামরিক হামলা চালানো। এর পরিণতি হতে পারে আরও দীর্ঘস্থায়ী সংকট।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রথম পথটি বেছে নিলে তা হবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর তেহরানকে দেওয়া সবচেয়ে বড় ছাড়। বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালিতে ইরানের তদারকি সাময়িক হলেও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাবে। অথচ ট্রাম্প প্রশাসন এটিকে প্রতিরোধ করার অঙ্গীকার করেছিল।

অন্যদিকে বড় ধরনের নতুন বিমান হামলা রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে। আগের বোমাবর্ষণেও তেহরান নতি স্বীকার করেনি। নতুন হামলায় সাফল্যের সম্ভাবনা খুব একটা বাড়ছে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তৃতীয় পথ হিসেবে বর্তমান নড়বড়ে পরিস্থিতি বজায় রাখাও সম্ভব। অর্থাৎ ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ চালু রাখা এবং জাহাজে হামলার জবাবে মাঝে মাঝে প্রতিশোধমূলক আক্রমণ চালিয়ে যাওয়া। কিন্তু এতেও কোনো সম্মানজনক প্রস্থানের পথ তৈরি হয় না। মধ্য এপ্রিলের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে—এমন প্রাথমিক ধারণার সঙ্গেও মিলছে না।

সাবেক মধ্যপ্রাচ্য মধ্যস্থতাকারী অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ট্রাম্পের সামনে এখন খারাপ বিকল্পের লম্বা তালিকা। তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছেন, এই যুদ্ধ অনির্দিষ্টকাল ধরে চালিয়ে যাওয়া যাবে না। কোথাও না কোথাও ছাড় দিতেই হবে। সেটা হতে পারে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নতুন বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া।

রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে এক মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জানিয়েছেন, যেকোনো সাময়িক নৌচলাচল পথ সম্পূর্ণ বাধাহীন থাকবে এবং কোনো একপক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দৃঢ়ভাবে বলেছেন, বিশ্বের তেল ও এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনের হরমুজ প্রণালি কোনোভাবেই ইরানের নিয়ন্ত্রণে বা তাদের ফি আদায়ের অধীনে থাকতে পারে না। এটিকে উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক পানিপথ হিসেবে রাখতে হবে। তবে ট্রাম্প আগেও যুদ্ধসংক্রান্ত অনেক বিষয়ে রুবিওর বক্তব্য খণ্ডন করেছেন। এবারও তার ব্যতিক্রম নাও হতে পারে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।

যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দাম বেড়েছে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমছে এবং সাধারণ আমেরিকানদের মধ্যে এই যুদ্ধ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ফলে প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক ঘর ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, হুমকি দিয়ে ইরানকে নতি স্বীকার করানো যাচ্ছে না। বরং এখন ট্রাম্পকেই সবচেয়ে বড় ছাড় দিতে হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এখন আলোচনার টেবিলে ফেরার প্রধান শর্ত। ওয়াশিংটন চায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হোক ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, যা ছিল সামরিক অভিযানের ঘোষিত মূল লক্ষ্য।

কিন্তু ইরান-ওমান চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। ইরানি এক জ্যেষ্ঠ সূত্র এবং আঞ্চলিক দুজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত শর্ত অনুযায়ী পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজের ওপর তেহরান কিছু তদারকি বা নিয়ন্ত্রণ পাবে। ট্রাম্প জলপথ চালুর চুক্তিকে ‘আসন্ন’ বললেও ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক খুঁটিনাটি বিষয় এখনো অমীমাংসিত।

এমনকি চুক্তি চূড়ান্ত হলে বা আলোচনা আবার শুরু হলেও বিশেষজ্ঞরা চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। জুন মাসের খসড়া সমঝোতা স্মারক ইতোমধ্যেই ব্যর্থ হয়েছে। ওই চুক্তিতে ইরানকে শুরুতেই কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যা রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল।

হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময়ও এই যুদ্ধ কোনো না কোনোভাবে চলতে থাকবে। এটা প্রশাসনের কর্মকর্তারা মেনে নিচ্ছেন। সেপ্টেম্বর থেকেই কিছু রাজ্যে আগাম ভোটগ্রহণ শুরু হচ্ছে।

ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার সময় বিদেশনীতিতে অযথা হস্তক্ষেপ না করা এবং আমেরিকানদের অর্থনৈতিক সমস্যায় মনোযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতি তার ঠিক উল্টো। ফলে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে থাকা রিপাবলিকানদের জন্য এটি বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে।

তবে মার্কিন কর্মকর্তা বলছেন, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত কোনো জনমত জরিপ দিয়ে চলে না। তিনি নিয়মিত দাবি করে আসছেন যে ইরানের অনেক নেতাকে হত্যা এবং তাদের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করে তিনি জয়ী হয়েছেন। কিন্তু বেশিরভাগ বিশ্লেষক মনে করেন, যুদ্ধের মূল লক্ষ্য অর্জনে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন।

সম্প্রতি ট্রাম্প জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর কূটনৈতিক সুযোগ দেওয়ার অনুরোধের কারণে তিনি বড় ধরনের নতুন হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করেছেন। তবে কূটনীতি ব্যর্থ হলে কঠোর আঘাত হানার হুমকিও দিয়ে রেখেছেন। কিছু বিশ্লেষকের মতে, এই পিছু হটার পেছনে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগও কাজ করতে পারে। যদিও ট্রাম্প অস্ত্র সংকটের কথা অস্বীকার করেছেন।

লস ভেগাসে এক সমাবেশে তিনি বলেছেন, আমি চুক্তি করতেই বেশি পছন্দ করব, কারণ আমি মানুষ হত্যা করতে চাই না। তবে একটা পর্যায়ে গিয়ে সেটাও করতে হতে পারে।

অন্যদিকে ইরান ওয়াশিংটনের উপসাগরীয় মিত্রদের সতর্ক করে বলেছে, কোনো নতুন মার্কিন হামলা হলে তাদের জ্বালানি অবকাঠামোতে পাল্টা আঘাত হানা হবে।

সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোনাথন প্যানিকফ মনে করেন, চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া এই যুদ্ধ খুব ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি বলেন, আগামী বছরগুলোতে মার্কিন সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা কোথায়,তারা এখন সেটাই শিখছে।

এমনকি যারা ইরানবিরোধী নীতি সমর্থন করেছিলেন, তারাও এখন সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসির গবেষক বেনাম বেন তালেবলু এক্সে লিখেছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান নভেম্বরের আগে ট্রাম্পকে একটি উভয় সংকটে ফেলার চেষ্টা করছে। প্রশাসনের উচিত তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়া এবং নিজেদের প্রকৃত ক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করা।