শিশুর মনও কি ফেসবুকের অ্যালগরিদমের পণ্য?

একসময় মানুষ তাহার যাপিত জীবনের বৃহত্তর সময় পার করিত জনসমাজের মধ্যে। বাস্তবতা হইল, এখন মানুষ তাহার সিংহভাগ সময় পার করে অ্যালগরিদমের সমাজে। মানুষের অবসর, মনোযোগ, কৌতূহল, এমনকি নিঃসঙ্গতাও আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পণ্যে পরিণত হইয়াছে। পৃথিবীর বৃহত্তর অংশের মানুষ দিনের একটি বড় সময় ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক কিংবা অনুরূপ প্ল্যাটফরমে কাটায়। ফলে, এই প্ল্যাটফরমগুলি আর কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নহে, ইহারা মানুষের মনস্তত্ত্ব নির্মাণের শক্তিশালী যন্ত্র। বিশেষত, শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব আরও গভীর। কারণ, ভালো ও মন্দের সূক্ষ্ম পার্থক্য অনুধাবনের পূর্ণ মানসিক সক্ষমতা তাহাদের এখনো বিকশিত হয় নাই। এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের আদালত ফেসবুকের ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান 'মেটা'কে প্রায় ৫৭ কোটি ডলার জরিমানা করিয়াছে এবং সেই অর্থ শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা তহবিলে প্রদান করিবার নির্দেশ দিয়াছে। ইহার সহিত প্ল্যাটফরমে এমন পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে, যাহাতে শিশুদের আসক্তি, যৌন হয়রানি ও মানসিক ক্ষতির ঝুঁকি কমে। যুক্তরাষ্ট্রের ৪০টির অধিক অঙ্গরাজ্য এবং ১ হাজার ৩০০টিরও অধিক স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলির বিরুদ্ধে মামলা করিয়াছে। ইহা প্রমাণ করে, সমস্যাটি বিচ্ছিন্ন নহে-ইহা বৈশ্বিক। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের এই রায় কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দেওয়া দণ্ড নহে-ইহা সমগ্র ডিজিটাল বিশ্বের প্রতি একটি সতর্কবার্তা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রকৃত শক্তি কনটেন্টে নহে, কনটেন্ট নির্বাচনকারী অ্যালগরিদমে। ব্যবহারকারী কী দেখিবে, কতক্ষণ দেখিবে, পরের ভিডিও বা পোস্ট কী হইবে, তাহা নির্ধারণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর সুপারিশব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য যদি কেবল ব্যবহারকারীর স্ক্রিন-সময় বৃদ্ধি, জনপ্রিয়তা কিংবা বিজ্ঞাপন-আয় হয়, তাহা হইলে মানুষের মানসিক সুস্থতা সেইখানে সহজেই দ্বিতীয় স্থানে চলিয়া যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে এই বিপদ বহু গুণ বৃদ্ধি পায়। কারণ, তাহারা সহজেই উত্তেজনাকর, বিভ্রান্তিকর বা ক্ষতিকর কনটেন্টের প্রতি আকৃষ্ট হয়। অ্যালগরিদম আবার সেই আগ্রহকেই 'সত্য' বলিয়া ধরে এবং একই ধরনের আরও কনটেন্ট তাহাদের সামনে উপস্থিত করে। ফলত তাহারা এক মানসিক বদ্ধচক্রে বন্দি হইয়া পড়ে।

মেটা দাবি করিতেছে, ক্ষতিকর কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণে তাহারা এআই ব্যবহার করে; কিন্তু বাস্তবতা হইল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখনো নৈতিক বোধসম্পন্ন সত্তা নহে। ইহা পরিসংখ্যান বোঝে, মানবমন বোঝে না। বহু ক্ষেত্রেই এআই ক্ষতিকর বিষয় শনাক্ত করিতে ব্যর্থ হয়, আবার নিরীহ বিষয়কেও ভুলভাবে চিহ্নিত করে। রয়টার্সের অনুসন্ধানে মেটার অভ্যন্তরীণ নথিতে এমন তথ্যও প্রকাশ পাইয়াছে যে, তাহাদের এআই চ্যাটবট শিশুদের সহিত প্রেম কিংবা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কথোপকথনে জড়াইতে পারে। ইহা প্রযুক্তিগত ত্রুটি মাত্র নহে-ইহা নকশাগত ব্যর্থতা এবং নৈতিক দায়ও বটে।

অতএব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুপারিশব্যবস্থা কেবল জনপ্রিয়তা, ক্লিক বা বাণিজ্যিক লাভের নিরিখে পরিচালিত হইতে পারে না। অ্যালগরিদমের সাফল্যের মানদণ্ডে মানুষের মানসিক নিরাপত্তা, শিশুর বিকাশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জনকল্যাণকে সমান গুরুত্ব দিতে হইবে। এআই-নির্ভর যাচাইব্যবস্থার আরও উন্নত সংস্করণ গড়িয়া তুলিতে হইবে, যেইখানে মনোবিজ্ঞানী, শিশুবিকাশ বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ এবং নীতিনির্ধারকদের জ্ঞানও প্রযুক্তির সহিত সংযুক্ত থাকিবে। প্রযুক্তির সিদ্ধান্তকে একক সত্য বলিয়া মানিলে চলিবে না। এই ক্ষেত্রে মানবিক তত্ত্বাবধান অপরিহার্য।

রাষ্ট্রের দায়িত্বও কম নহে। শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনগতভাবে নিশ্চিত করা, প্ল্যাটফরমগুলির স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা এবং স্বাধীন নিরীক্ষার ব্যবস্থা গড়িয়া তোলা আজ সময়ের দাবি। ইহার পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও শিশুদের ডিজিটাল সাক্ষরতা গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করিতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে, প্রযুক্তি মানুষের জন্য, মানুষ প্রযুক্তির জন্য নহে। শিশুর মন যদি অ্যালগরিদমের পরীক্ষাগারে পরিণত হয়, তাহা হইলে ভবিষ্যৎ সমাজের মানসিক স্বাস্থ্যও অনিশ্চিত হইয়া পড়িবে। অতএব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রকৃত সাফল্য ‘মুনাফা’য় নহে-মানুষের, বিশেষ করিয়া শিশুদের, নিরাপদ বিকাশ নিশ্চিত করিবার মধ্যেই তাহার সর্বোচ্চ সার্থকতা নিহিত। মেটাকে তাহা বুঝিতে হইবে।