বাংলামোটরে শিশুর মৃত্যু নিয়ে রহস্য

রাজধানীর বাংলামোটরের এক বাড়ি থেকে আড়াই বছরের শিশু নূর সাফায়েতের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় তার বাবা নুরুজ্জামান কাজলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। পাশাপাশি শিশুটির মৃত্যু নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। ময়না তদন্ত রিপোর্টে শিশুটির মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। শুধু কপালে আঘাতের চিহ্ন থাকলেও সেই কারণে মৃত্যু হয়েছে কি-না নিশ্চিত হতে পারেনি মেডিক্যাল বোর্ড।

শিশু সাফায়াতের ময়না তদন্তে তার শরীরে ধারালো কোনো অস্ত্রের আঘাত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন ময়না তদন্তকারী চিকিত্সক। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) মর্গে ওই শিশুর ময়না তদন্ত করে তিন সদস্যের বোর্ড। ঢামেকের ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদের নেতৃত্বে এই মেডিক্যাল বোর্ডে আরও ছিলেন ডা. প্রদীপ বিশ্বাস ও কবির সোহেল। 

ময়না তদন্ত শেষে ডা. সোহেল মাহমুদ জানান, সাফায়াতের শরীরে বাহ্যিক আঘাতের চিহ্ন আছে। কপালে একটি ছোট আঘাতের চিহ্নও পাওয়া গেছে। তবে তাতে কোনো রক্তক্ষরণ হয়নি। তার ব্রেইন ও লিভারও কিছুটা ফোলা পাওয়া গেছে। তবে অপুষ্টি ও অসুস্থতার কারণে এই ফোলা হতে পারে। তার ব্র্রেইন, লিভার, ব্লাড হিস্টোপ্যাথলজিতে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, শিশুর শরীরে কোনো ধারালো অস্ত্রের আঘাত ও বিদ্যুত্স্পৃষ্টের আলামত নেই। তার কপালে যে আঘাতটি রয়েছে তা পড়ে গিয়েও হতে পারে। তবে ওই আঘাত তার মৃত্যুর জন্য দায়ী কিনা বা কিভাবে তার মৃত্যু হয়েছে তা হিস্টোপ্যাথলজির রিপোর্ট পাওয়ার পর বলা যাবে।

এদিকে কাজলের রিমান্ড আবেদনের শুনানি করেন ঢাকার মহানগর হাকিম ধীমান চন্দ্র মণ্ডল। এর আগে বুধবার ছয় ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস নাটকীয়তার পর বাংলামোটর লিংক রোডের ১৬ নম্বর বাড়ি থেকে সাফায়েতের কাফন মোড়ানো লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পাশাপাশি তার ভাই চার বছর বয়সী সুরায়েতকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

‘মাদকাসক্ত’ কাজল ছোট ছেলেকে ‘হত্যা করে’ বড় ছেলেকে কোলে   নিয়ে দা হাতে ঘরের ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছেন খবর পেয়ে বুধবার সকালে ওই বাড়িতে যায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। দীর্ঘ চেষ্টার পর বেলা ২টার দিকে সংকটের অবসান হয়।

কাজলের ভাই নুরুল হুদা উজ্জ্বল সে সময় বলেছিলেন, ‘ও (কাজল) সারাদিন নেশা করে, খায় আর ঘুমায়। এটা ওর নিজের বাড়ি। চাচার সঙ্গে গত ঈদের আগেও মারামারি করেছে। এত দিন আমরা সহ্য করছি, পুলিশ আনি নাই, শুধু ওই বাচ্চাগুলোর কারণে। এখন বাচ্চাটাকেই মেরে ফেলছে। কাজলের মার খেয়ে ওর বৌ বাপের বাড়ি চলে গেছে। বাসায় দুই বাচ্চা নিয়ে ও থাকত। আজকে শিশুটিকে হত্যা করেই ফেলল।’  তবে আটক হওয়ার পর কাজল পুলিশের কাছে দাবি করেন, সাফায়াতের মৃত্যু হয়েছে বৈদ্যুতিক শকে, তিনি তাকে হত্যা করেননি।

সাফায়াতের মা মালিহা আক্তার রাতে কাজলের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন বলে শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান জানান। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই চম্পক চক্রবর্তী গতকাল কাজলকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। অন্যদিকে কাজলের পক্ষে রিমান্ড আবেদনে বিরোধিতা করেন আইনজীবী আবদুস সাত্তার। তিনি বলেন, কাজলের বাড়ি নিজের নামে লিখিয়ে নিতে চাইছিলেন তার স্ত্রী মালিহা। তা না দেওয়ায় তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে যান। কাজল দুই সন্তানের অন্তত একজনকে নিয়ে যাওয়ার জন্য মালিহাকে অনুরোধ করেছিলেন। সেজন্য তাকে পরে উকিল নোটিসও  দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মালিহা শিশু দুটোকে ওই বাড়িতেই ফেলে রাখেন। শুনানি শেষে বিচারক কাজলকে তিন দিনের রিমান্ড দেন।

কাজল শুনানিতে ছেলের মৃত্যুর বিষয়ে কোনো কথা বলেননি। তবে আদালতের বাইরে তিনি সাংবাদিকদের সামনে দাবি করেন, ছেলেকে তিনি মারেননি। আগের দিন বিদ্যুত্স্পৃষ্টে সাফায়েতের মৃত্যুর কথা বললেও আদালতের বাইরে কাজল সাংবাদিকদের বলেন, তার ছেলের জ্বর হয়েছিল, মারা গেছে ঘুমের মধ্যে।