চামড়া নিয়ে নতুন সংকট

ট্যানারিতে কাঁচা চামড়া দিচ্ছে না আড়তদাররা

গতকাল থেকে ট্যানারি মালিকরা কাঁচা চামড়া কেনার কথা থাকলেও বকেয়া টাকা পরিশোধের দাবিতে বেঁকে বসেছে আড়তদাররা। ফলে ট্যানারিতে আড়তদারদের হাতে থাকা চামড়া বিক্রি হয়নি। এতে নতুন সংকট দেখা দিয়েছে। গতকাল সকালে পুরান ঢাকার পোস্তায় কাঁচা চামড়া ও আড়তদারদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড এন্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএইচএসএমএ) নেতারা এক সভা করে বকেয়া পরিশোধের আগে চামড়া বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সভা শেষে সংগঠনের সভাপতি হাজী দেলোয়ার হোসেন উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে সারা দেশে কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। বকেয়া টাকা পরিশোধ না করলে আমরা ট্যানারির কাছে চামড়া বিক্রি করব না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আড়তদারদের কাছেই বেশিরভাগ মজুত চামড়া রয়েছে। ঐ চামড়া বিক্রি না হওয়ায় ট্যানারি মালিকরা বিচ্ছিন্নভাবে আসা কিছু চামড়া কিনতে পেরেছে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) ট্রেজারার মিজানুর রহমান গতকাল বিকালে ইত্তেফাককে বলেন, আড়তদার ও কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ীরা বকেয়া টাকার জন্য চামড়া বিক্রি বন্ধ রেখেছে। এর বাইরে বিচ্ছিন্নভাবে আসা কিছু চামড়া আমরা কিনেছি। তারা আগামীকালের (আজ রবিবার) মন্ত্রণালয়ের বৈঠকের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় বসে আছে।

চামড়া নিয়ে উদ্ভূত সংকট মোকাবিলায় সারা দেশের কাঁচা চামড়া ও ট্যানারি ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আজ রবিবার বিকালে সভা করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ঐ সভায় চামড়া রপ্তানির বিষয়ে সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে পর্যালোচনা হবে। অন্যদিকে ট্যানারি মালিকদের কাছে বকেয়া থাকা কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের অর্থ পরিশোধ কিংবা ভবিষ্যতে কীভাবে ব্যবসা হবে—তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে চামড়ার দরে ভারসাম্য রেখে কোরবানির পশুর চামড়ার সুবিধাভোগীদের জন্য (মাদ্রাসা, এতিমখানাসহ এ জাতীয় প্রতিষ্ঠান ও গরিব মানুষ) যথাযথ দর নিশ্চিত করার উপায় নিয়েও আলোচনা হবে।

আড়তদারদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেছে, অতীতের বকেয়া অর্থ পরিশোধ ও ভবিষ্যতে নগদ অর্থে চামড়া বিক্রির নিশ্চয়তা পেলে ট্যানারির কাছে চামড়া বিক্রি শুরু করবে তারা। অন্যথায় চামড়া রপ্তানির বিষয়ে সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত বহাল রাখার দাবি জানাবেন। হাজি দেলোয়ার হোসেন গতকাল সন্ধ্যায় ইত্তেফাককে বলেন, চামড়া বিক্রি নিয়ে আমরা কোনো ধর্মঘট করছি না। আমরা ২০১৫ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত ট্যানারি মালিকদের কাছে দেশব্যাপী ৩৫০ কোটি থেকে ৪০০ কোটি টাকা বকেয়া পাওনা। শুধু ঢাকাতেই পাওনা ১০০ কোটি টাকার বেশি। এই অর্থ পরিশোধ করা এবং আগামীতে কীভাবে ব্যবসা করবে—তা নিশ্চিত হয়ে ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়া বিক্রি করতে চাই। অন্যথায় যদি রপ্তানির সুযোগ থাকে, আমরা ঐ পথেই হাঁটব।

তবে কাঁচা চামড়া রপ্তানির বিষয়টি এত সহজ হবে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টি স্বীকার করেছেন হাজি দেলোয়ার হোসেন নিজেও। তিনি বলেন, কাঁচা চামড়া রপ্তানিতে আমরা অভ্যস্ত নই। কখনো হয়েছে বলেও জানা নেই।

অন্যদিকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি স্থানান্তর হলেও তা পরিবেশবান্ধব করতে না পারা, এর ফলে ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বিদেশি বায়ারদের কাছে চামড়া বিক্রি কমে যাওয়াসহ নিজেদের আর্থিক ক্ষতির বিষয়গুলো তুলে ধরবেন ট্যানারি মালিকরা। একই সঙ্গে চামড়া শিল্পনগরীতে সরকার কর্তৃক বরাদ্দকৃত প্লটের নিবন্ধন দেওয়াসহ সরকারের কাছে ব্যাংকঋণের সুবিধাসহ আর্থিক সুবিধা চাইবেন তারা। 

এদিকে শুরুতে কাঁচা চামড়া রপ্তানির সিদ্ধান্ত দিলেও বিষয়টি নিয়ে এখনো সিদ্ধান্তহীনতা রয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মফিজুল ইসলাম ইতিমধ্যে ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, সরকার নির্ধারিত মূল্যে ট্যানারিগুলো চামড়া কিনলে স্থানীয় শিল্পের স্বার্থে আমরা রপ্তানি করতে দেব না। তবে গতকাল থেকে আড়তদারদের নতুন অবস্থানের পরে এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত আসে—তা দেখতে অপেক্ষায় সংশ্লিষ্টরা। অবশ্য অর্থনীতিবিদসহ অনেকেই বলছেন, কাঁচা চামড়ার বাজারে ভারসাম্য আনতে ও সিন্ডিকেটের কবল থেকে রক্ষা করতে চামড়া রপ্তানির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা উচিত হবে না। কেননা ট্যানারি মালিকদের হিসাবেই এখনো অর্ধেক চামড়া অবিক্রীত রয়ে গেছে। ফলে চাহিদার চেয়ে যোগান বেশি হওয়ায় সরকার নির্ধারিত মূল্যে চামড়া বিক্রির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা কঠিন। এ পরিস্থিতিতে কিছু পরিমাণ কাঁচা চামড়া রপ্তানির সিদ্ধান্ত যৌক্তিক। অন্যথায় প্রতিবছরই চামড়ার প্রকৃত উপকারভোগীদের বঞ্চিত হওয়ার দৃশ্য দেখতে হবে।