কক্সবাজারে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার মামলায় আটক ব্যক্তি প্রতারণামূলক ভাবে নিজেকে পরিচয় দেন ‘সোনা মিয়া’। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় এ মামলায় পাঁচ অভিযুক্তের মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়। সেখানে কক্সবাজার পৌরসভা ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা 'সোনা মিয়া'ও মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। সম্প্রতি তিনি গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়ার পর তার দেওয়া তথ্যের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, প্রকৃত সাজা পাওয়া আসামি কারান্তরীণ সোনা মিয়া নন।
২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির ছবি ও মায়ের নাম এবং আরও কিছু তথ্যে অমিল পেয়ে কারা কর্তৃপক্ষ আদালতে বিষয়টি জানান। এরপরই শুরু হয় তোলপাড়।
জেলা ও দায়রা জজ বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রতিবেদন দিতে জেলা পুলিশ সুপারকে নির্দেশনা দেন। সেই আলোক কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী প্রতিবেদন দেন কারান্তরিণ হওয়া সোনা মিয়া দণ্ড পাওয়া অভিযুক্ত নন। প্রথম যে ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে সোনা মিয়া পরিচয় দিয়েছিলেন।
তিনি জামিনে বেরিয়ে লাপাত্তা হবার পর ওয়ারেন্ট মূলে এখন যিনি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়ায় গ্রেপ্তার করা হয়েছেন তিনিই সেই জন্ম নিবন্ধনের আসল মালিক সোনা মিয়া। আর সোনা মিয়া পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি রোহিঙ্গা রমজান। চলতি পথে সোনা মিয়ার সঙ্গে গভীর বন্ধুত্বের সূত্র ধরে কৌশলে সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন চুরি করে তিনি অপরাধ কর্মের পর নিজেকে সোনা মিয়া পরিচয় দিয়েছেন।
আদালত এ প্রতিবেদন পেয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ততকালীন ডিবি শাখার পরিদর্শক মানস বড়ুয়াকে তলব করেন। তিনিও লিখিত দেন ওই সময় গ্রেফতার হওয়া সোনা মিয়া পরিচয় দেয়া ব্যক্তি এখন কারাগারে থাকা সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন।
একইভাবে পুলিশ সুপারের প্রতিবেদন এবং একই মামলায় কারাগারে থাকা অন্য সাজাপ্রাপ্ত আসামীর জবানবন্দিতে উঠে আসে আসলেই সোনা মিয়া অপরাধের সাথে জড়িয়ে ঘটনার সময় গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি নন।
সকল প্রতিবেদন নেয়ার পর বিষয়টি উচ্চ আদালতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে পরামর্শ নেওয়া হয়। সবকিছু পর্যালোচনায় আদালত সিদ্ধান্ত উপনীত হয় যে, কারান্তরিণ ব্যক্তি সাজাপ্রাপ্ত আসামি সোনা মিয়া নয়। তাই তাকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন আদালত।
তবে, এনআইডি ও পাসপোর্ট আদালতে জমা দেয়া, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিদেশ না যাওয়া, প্রতিমাসের প্রথম মঙ্গলবার কক্সবাজার সদর থানায় হাজিরা দিয়ে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করার শর্তে তাকে কারামুক্তি দেওয়া হয়।
আর প্রতি তিনমাস পর সদর থানা সোনা মিয়ার উপস্থিতি ও অবস্থান বিষয়ক প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করার নির্দেশনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নাজির মো. বেদারুল আলম।
কক্সবাজার জেলা কারাগারের জেলার মো. দেলোয়ার জাহান বলেন,
কারান্তরীণ সোনা মিয়াকে মুক্তি দিতে কিছু নির্দেশনাসহ আদালতের আদেশ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কারাগারে আসে। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে সকল আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বেলা ১১টার দিকে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
জেলার আরও জানান, সবার সহযোগিতায় একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচাতে পারলাম আমরা। সোনামিয়া যখন কারাগারে এলেন, তখন রোলকলে তিনি জানতে চান কি অপরাধে তাকে কারাগারে আনা হয়েছে?
তাকে জানানো হয়, মাদক উদ্ধার মামলায় মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামি হিসেবে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি অবাক হয়ে বলেন, আমি তো কোনো মামলায় আসামি ছিলাম না আগে কখনো কারাগারে আসিনি। তখন পুরোনো নথি বের করে তথ্য ও ছবিতে গরমিল পেয়ে খটকা লাগে। বিষয়টি আদালতে জানানোর পর নানা তদন্ত ও প্রতিবেদন এবং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অবশেষে তিনি মুক্তি পেয়েছেন।
কী ঘটেছিল সেদিন
আদালতের নির্দেশে কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলীর দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২০ সালে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম রমজান। তিনি অন্য একটি জন্ম নিবন্ধন ব্যবহার করে নিজেকে সোনা মিয়া পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে ওই মামলায় তাকেই সোনা মিয়া হিসেবে আসামি করে বিচার চলে এবং পরবর্তীতে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়।
রায়ের পর গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা প্রকৃত সোনা মিয়া দাবির ছিল, তিনি ইয়াবা মামলার সঙ্গে জড়িত নন। তার আবেদনের পর আদালতের নির্দেশে পুলিশের তদন্তে ২০২০ সালের গ্রেফতার ও ২০২৬ সালের গ্রেফতারের দুই ব্যক্তির পরিচয়, শারীরিক গঠন ও পারিবারিক তথ্যেও ব্যাপক অমিল পাওয়া যায়।
মামলা সূত্রে জানা যায়, ঘটনাটি ২০২০ সালের ২ মার্চের। ওইদিন কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) অভিযান চালিয়ে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। মামলার এজাহারে দ্বিতীয় আসামি হিসেবে ‘সোনা মিয়া’, পিতা নজির আহমদ, ঠিকানা কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়া এবং স্থায়ী ঠিকানা রামু উপজেলার গর্জনিয়া উল্লেখ করা হয়।
তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মানস বড়ুয়া ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, দ্বিতীয় আসামি সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা যাচাই করে সঠিক পাওয়া যায়নি। কক্সবাজার সদর ও রামু থানা পুলিশ দিয়ে অনুসন্ধান করেও তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ কারণে আসামিকে কারাগারে রেখে পরবর্তী বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করার অনুরোধ করা হয়।
নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৩ জুন ‘সোনা মিয়া’ কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে জামিন পান। জামিনে বের হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত এ মামলার পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন।
রায়ের পর গত ২৩ জুন র্যাব-১৫ এর সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার ওয়ারেন্টমূলে ‘সোনা মিয়াকে’ গ্রেপ্তার করে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠান।
কারাগারে যাওয়ার দুই-তিন দিন পর বিষয়টি নতুন মোড় নেয়। কারাগারে থাকা সোনা মিয়া জেল সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করে জানান, তিনি ওই মামলার আসামি নন। পরে জেল সুপার বিষয়টি কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতকে অবহিত করেন। আদালত বিষয়টি যাচাই করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কক্সবাজার সদর থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন।
গত ২ জুলাই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি এবং ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেফতার হওয়া সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন। ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি নিজের পরিচয় গোপন করে সোনা মিয়ার জন্ম নিবন্ধন ব্যবহার করেছিলেন। তার প্রকৃত নাম রমজান।
পুলিশের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রমজান ও সোনা মিয়া একই সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাস করতেন। পরে ক্যাম্প থেকে পালিয়ে তারা কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় একই ঘরে বসবাস শুরু করেন। কোনো এক সময় সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন কার্ড রমজানের কাছে থেকে যায়। সেই জন্ম নিবন্ধনের ফটোকপি দেখিয়েই রমজান নিজেকে সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুই সময়ের কারাগার-সংরক্ষিত তথ্যেও রয়েছে বড় ধরনের অমিল। ২০২০ সালে গ্রেপ্তার ব্যক্তির বাবার নাম মৃত নজির আহমদ, মাতার নাম সোনারা বেগম এবং স্ত্রীর নাম আয়েশা। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে ছিল। ছেলে মোহাম্মদ আলী। উচ্চতা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং ওজন ৫০ কেজি। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে বাম ও ডান গালে এবং ডান বাহুতে ক্ষত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেপ্তার সোনা মিয়ার বাবার নামও মৃত নজির আহমদ উল্লেখ থাকলেও তার মায়ের নাম মাহমুদা খাতুন এবং স্ত্রীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস। তার এক ছেলে ও তিন মেয়ে। ছেলের নাম ওমর ফারুক এবং মেয়ের নাম নাহিদা। তার উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি, ওজন ৪২ কেজি। শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে ডান বাহুতে তিল, পেটের বাম পাশে তিল এবং পিঠের মাঝখানে তিল থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আব্দুল মন্নান বলেন,
মামলাটি দায়ের থেকে শুরু করে অভিযোগপত্র দাখিল পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় তদন্ত কর্মকর্তার চরম গাফিলতি রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। অন্যের জন্ম নিবন্ধন ব্যবহার করে কেউ সেই পরিচয় দিলে সেটি যাচাই করে দাবিকৃত ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করা বাঞ্ছনীয়। সেটা করা না হলেও একজন নিরপরাধ ব্যক্তি কারাগার এবং মৃত্যুদণ্ড হতে মুক্তি পাওয়া আনন্দের।
সোনা মিয়া ও তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস কারাগেইটে সাংবাদিকদের বলেন, রোহিঙ্গার সাথে বন্ধুত্ব এবং নিজের জন্মনিবন্ধন নিয়ে প্রতারণার ফাঁদে নামটি মৃত্যুদণ্ডের গ্যাঁড়াকলে পড়েছিল। কারা কর্তৃপক্ষ, আদালত, পুলিশ প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্টদের কারণে নতুন জীবন পেলাম আমরা।
আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও তাদের সঙ্গে কোনো কিছু বিনিময় বা তারা কোন কিছু হাতিয়ে নিচ্ছে কি না সে বিষয়ে সতর্ক হওয়ার অনুরোধ করেন এ দম্পতি।
কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, আদালতের নির্দেশে পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করেছিল। জেনেছি আজ (১৪ আগস্ট) সোনা মিয়া কারাগার হতে মুক্তি পেয়েছেন। আদালতের নির্দেশনার কপি এখনও থানায় আসেনি। আদেশ হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী কার্যক্রমের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।