মালয়েশিয়ায় পাসপোর্ট জালিয়াতি চক্রের দুই বাংলাদেশি ‘মূলহোতা’ গ্রেপ্তার

মালয়েশিয়ায় বিদেশি শ্রমিকদের ভিসা নবায়ন সহজ করতে সক্রিয় একটি পাসপোর্ট জালিয়াতি চক্রের সন্ধান পেয়েছে দেশটির অভিবাসন বিভাগ। দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় এই চক্রটি স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ‘আনফিট’ বা অযোগ্য ঘোষিত বিদেশি শ্রমিকদের ভুয়া পাসপোর্ট সরবরাহ করত।

সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৩ আগস্ট কুয়ালালামপুরের দুটি আবাসিক ইউনিটে অভিযান চালিয়ে ২৯ ও ৩২ বছর বয়সী দুই বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ইমিগ্রেশন মহাপরিচালক দাতুক জাকারিয়া শাবান জানান, পাসপোর্ট জালিয়াতি ও বিকৃতির অভিযোগে গত ৫ আগস্ট তিন ইন্দোনেশীয় নাগরিক গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সেই জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের গোয়েন্দা ও বিশেষ অভিযান বিভাগ এক সপ্তাহ ধরে নজরদারি চালিয়ে অভিযান পরিচালনা করে। এতে দুই বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে একজন এই জালিয়াতি চক্রের মূল হোতা বলে জানিয়েছে বিভাগটি।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রায় এক বছর ধরে এই সিন্ডিকেটটি সক্রিয় রয়েছে। সন্দেহভাজন মূল পরিকল্পনাকারীর কাছে নির্মাণ খাতের একটি অস্থায়ী কর্মসংস্থান ভ্রমণ পাস ছিল। আর অপর সন্দেহভাজন ব্যক্তির ভিসার মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। মূল পরিকল্পনাকারী প্রায় নয় বছর ধরে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন।

চক্রটির কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে ইমিগ্রেশন মহাপরিচালক জানান, এই সিন্ডিকেট মূলত সেই সব বিদেশি কর্মীকে টার্গেট করত, যারা ‘ফরেন ওয়ার্কার্স মেডিকেল এক্সামিন মনিটরিং এজেন্সি’ (ফোমেমা)-র স্ক্রিনিংয়ে অকৃতকার্য বা অযোগ্য বলে বিবেচিত হতেন। এ ক্ষেত্রে পাসপোর্টের ছবি পরিবর্তন করা হলেও ব্যক্তিগত পরিচয় মূল ব্যক্তিরই রাখা হতো। এরপর কোনো সুস্থ ব্যক্তি সেই অসুস্থ ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়া পাসপোর্টের মাধ্যমে চিকিৎসাপরীক্ষায় অংশ নিতেন। এ ছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ধোঁকা দিতে এবং বৈধ ভ্রমণ নথি হিসেবে প্রমাণ করতে জাল পাসপোর্টে ভুয়া প্রবেশ ও প্রস্থানের অনুমোদন সিলও যুক্ত করা হতো। প্রতিটি লেনদেনের জন্য চক্রটি ২০০ থেকে ৩০০ রিঙ্গিত আদায় করত।

অভিযানকালে কুয়ালালামপুরের তামান ওয়াহ্যু ও কাম্পুং বাতুর ওই দুটি আবাসিক ইউনিট থেকে বিপুল পরিমাণ জালিয়তির সামগ্রী জব্দ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে– দুটি আসল বাংলাদেশি পাসপোর্ট ও নয়টি জাল বাংলাদেশি পাসপোর্ট; তিনটি মোবাইল ফোন, দুটি ল্যাপটপ ও একটি প্রিন্টার ; ৭০০টি পাসপোর্ট পৃষ্ঠা এবং বিভিন্ন দেশের প্রায় ৩০০টি ভুয়া পাসপোর্ট কভার।

কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (কেএলআইএ)-এ প্রবেশের সন্দেহজনক জাল ইমিগ্রেশন স্ট্যাম্প এবং ইন্দোনেশিয়ার বাতাম ও বাংলাদেশের ঢাকা থেকে প্রস্থানের স্ট্যাম্প। এ ছাড়া তদন্তকারীরা মূল পরিকল্পনাকারীর একটি ই-ওয়ালেট অ্যাকাউন্ট থেকে অবৈধভাবে অর্জিত প্রায় ২ লাখ রিঙ্গিত উদ্ধার করেছেন।

কর্তৃপক্ষ জানায়, উদ্ধারকৃত পাসপোর্ট তৈরির উপকরণের পরিমাণ দেখে ধারণা করা হচ্ছে যে বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এবং তারা প্রায় ২ হাজার জাল পাসপোর্ট তৈরির উপকরণ মজুত রাখতে পারত। চক্রটি এতটাই দক্ষ ছিল যে, মাত্র কয়েক মিনিটেই একটি নিখুঁত জাল পাসপোর্ট তৈরি করে ফেলতে পারত।

এই জালিয়াতি চক্রটি প্রকাশ্যে কোনো ধরনের বিজ্ঞাপন দিত না। গ্রাহক সংগ্রহে তারা ফ্রিল্যান্স এজেন্ট ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের ওপর নির্ভর করত। জাল পাসপোর্ট তৈরিতে কোনো মুদ্রণ সংস্থা জড়িত ছিল কি না, তা-ও তদন্ত করে দেখছে পুলিশ। পাশাপাশি ক্লাং ভ্যালির বাইরে এই নেটওয়ার্কের অন্য কোনো সদস্য বা চক্র সক্রিয় রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পাসপোর্ট জালিয়াতির ঘটনায় গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ার অভিবাসন আইন ১৯৫৯/৬৩ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দেশটির অভিবাসন বিভাগ বলেছে, মূল পরিকল্পনাকারীর বিরুদ্ধে আইনের ৫৫ডি ও ৫৬(১)(ডি) ধারা এবং অপর ব্যক্তির বিরুদ্ধে ১৫(১)(সি) ধারায় তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে।