সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির অবসান ঘটেছে: মাহদী আমিন

প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেছেন, সরকারের ১৮০ দিনের বড় সাফল্য হচ্ছে ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা এবং নির্বাচনি অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন। তিনি আরো বলেন, ‘গত ছয় মাসে জনসম্পৃক্ত কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী দেশের যেখানেই গেছেন ঠিক জনগণের ঢল নেমে এসেছে। জনগণের আস্থা এবং বিশ্বাসকে ধারণ করে বর্তমানে সরকার দেশের মানুষের প্রতি দায়িত্ব এবং দায়বদ্ধতা নিয়ে এগিয়ে চলেছে।’ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, ‘সরকারের এই ছয় মাসে সবচাইতে ডিফারেন্ট ও চোখে লাগার মতো বিষয় হচ্ছে, নির্বাচনি ইশতেহারকে ধারণ করে প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য অবিরত কাজ চালিয়ে যাওয়া। আমরা দেখেছি গত ছয় মাসে সুদৃঢ় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কীভাবে সরকারের প্রতিটি কার্যক্রমে অনুমোদিত হয়েছে।’

গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ের ‘শাপলা’ হলে বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন তিনি। মাহদী আমিন বলেন, বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের গত ছয় মাসে দেশে বিগত দিনের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির পূর্ণ অবসান হয়েছে। বৈশ্বিক কূটনৈতিক ও বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখন ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি অনুসরণ করে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হচ্ছে। সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে। অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এখন কারো হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।

দেশের অর্থনৈতিক পরিবেশ গতিশীল করা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে মাহদী আমিন বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক হয়রানিমুক্ত পুলিশ ও প্রশাসন গড়ে তোলা হয়েছে। সরকারের এসব পদক্ষেপে গত ছয় মাসে জনগণের অভূতপূর্ব সমর্থন মিলেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। জনগণের দেওয়া গণরায় ও নির্বাচনি অঙ্গীকার পূরণের বিষয়ে তিনি জানান, ‘ভোটের কালি শুকানোর আগেই নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। ইশতেহারে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। নাগরিক সেবা ও অর্থনৈতিক সংস্কার জোরদারে ২০০টি ইলেকট্রনিক বাস আনার তথ্য জানিয়ে তিনি আরো উল্লেখ করেন, অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনতে সংস্কারের পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল প্রণয়নের কাজও অনেকটা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাসে সরকার সবার বাক্স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করেছে।

মাহদী আমিন বলেন, ‘গত ছয় মাসে বাক্স্বাধীনতা, আইন, অনুশাসন এবং মানবাধিকারের ক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ মানদণ্ড স্থাপন করতে পেরেছি, যেখানে একবারের জন্যও কোনো রাজনৈতিক নিপীড়ন হয়নি। আমরা দেখেছি সর্বোচ্চ বাক্স্বাধীনতার চর্চা, অনেক সময় সেটি সীমাও লঙ্ঘন করেছে। উসকানি দেওয়া হয়েছে, আবার অশোভন আচরণ করা হয়েছে। তারপরও শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সর্বোচ্চ ধৈর্য এবং সহনশীলতার মাধ্যমে সেটিকে ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছে বর্তমান জনগণের সরকার।

তিনি বলেন, ‘গত ছয় মাসে জাতীয় সংসদে অত্যন্ত প্রাণবন্ত এবং স্বতঃস্ফূর্ত অধিবেশনে এমপিরা একে অপরের আলোচনা-সমালোচনা করেছেন, যৌক্তিকভাবে বিভিন্ন বিষয় উপস্থাপন করেছেন। এই সরকারের গঠনের পর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই শতাধিক অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসবিরোধী সংশোধিত অধ্যাদেশকে সংসদে আইনে রূপান্তরের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ কায়েম করা সন্ত্রাসী একটি রাজনৈতিক সংগঠনকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।’ মাহদী আমিন বলেন, সরকারের অভূতপূর্ব কর্মযজ্ঞের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—অভূতপূর্ব জনসমর্থন, সুদৃঢ় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাফল্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, সব শ্রেণিপেশার মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন, আর্থিক খাতে সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, অবকাঠামো, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদাপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রধানমন্ত্রীর স্বতন্ত্র ভিন্নমাত্রিক নেতৃত্ব।

পরে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলীর সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান ও রুহুল কবির রিজভী, তথ্য ও সম্প্র্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম, তথ্য ও সম্প্র্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, তথ্য ও সম্প্র্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু বিষয়ক বিশেষ সহকারী সাইমুম পারভেজ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল আওয়াল উপস্থিত ছিলেন।

রাষ্ট্র ও মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠাই সরকারের বড় সাফল্য: সালেহ শিবলী

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী বলেন, রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করাই বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার তোষামোদ ও বন্দনার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করেছে। অতীতে মঞ্চে উঠে দীর্ঘ সময় বন্দনা করার যে প্রথা ছিল, তা থেকে সরকার সরে এসেছে।

সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব বলেন, ‘নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিটি দফা ধরে ধরে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অতীতে নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি এভাবে ধরে ধরে বাস্তবায়নের নজির দেখা যায়নি।’ রাজনীতিতে গুণমান পরিবর্তন আনাকে সরকারের অন্যতম বড় সাফল্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রাজনীতিতে গুণমান পরিবর্তন আনা হয়েছে। অতীতে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনার দায় সরাসরি সরকারের না থাকলেও জবাবদিহিতার অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে শোকাহত পরিবারের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। একজন রাষ্ট্রপ্রধানের সাধারণ মানুষের মতো চলাফেরা করা এবং নিজেকে আলাদা না ভাবাই নতুন বাংলাদেশের ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতিফলন।’

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি ও বিশৃঙ্খলার মাঝে বর্তমান সরকারের ছয় মাস (১৮০ দিন) পূর্ণ করে দেশ পরিচালনা করতে পারাই একটি বড় সফলতা।