ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কয়েক দিনের ব্যবধানে একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বাঁকুড়ায় ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) এক কর্মীর বাবা মোহাম্মদ মাফিককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। সোমবার (১৭ আগস্ট) এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে রাজ্য সরকারকে ১০ দিনের সময়সীমা দিয়েছেন সিজেপির শীর্ষ নেতা আশুতোষ রাঙ্কা।
ঘটনার পর দিল্লি থেকে সহকর্মীদের নিয়ে বাঁকুড়ার ইন্দাসের কারিশুন্ডা গ্রামে যান রাঙ্কা। সেখানে তিনি নিহত মাফিকের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। একই সঙ্গে সঠিক তদন্ত নিশ্চিত করতে স্থানীয় পুলিশের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে আদালতের তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান তিনি।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে এরই মধ্যে আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে নিহতের পরিবারের অভিযোগ, মাফিককে তাঁর বাড়িতে ঢুকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়।
মাফিকের ছেলে আবদুল হাফিজ সিজেপির সঙ্গে যুক্ত। দিল্লিতে দলটির বিভিন্ন কর্মসূচিতে তিনি সক্রিয় ছিলেন। এ কারণেই তাঁর বাবাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
রাঙ্কা বলেন, ১০ দিনের মধ্যে হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তার করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি ইন্দাস থানার পুলিশের ভূমিকা নিয়েও তদন্তের দাবি জানান তিনি। তাঁর অভিযোগ, ঘটনার পর পরিবারটি পুলিশের কাছ থেকে যথাযথ সহযোগিতা পায়নি।
নিহতের পরিবার রাজ্য সরকারের দেওয়া আর্থিক ক্ষতিপূরণ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আবদুল হাফিজ তাঁর বাবার স্মরণে এলাকায় একটি আন্তর্জাতিক মানের স্কুল প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই হবে বাবার প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা।
হাফিজের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে রাঙ্কা বলেন, সিজেপি তাঁকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করবে। পাশাপাশি রাজ্যজুড়ে ‘স্কুল ঠিক করো’ আন্দোলন গড়ে তোলার ঘোষণা দেন তিনি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার না হলে জেলা প্রশাসনিক ভবন ঘেরাওয়েরও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত শনিবার রাতে নদীয়া জেলায় কংগ্রেস নেতা আনিসুর রহমান ও তাঁর ছেলে আবু সুফিয়ানকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটে। আনিসুরের বয়স ৫৪ বছর এবং তাঁর ছেলে আবু সুফিয়ানের বয়স ২৩ বছর।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, রাত সাড়ে ৯টার দিকে আনিসুর তাঁর আইনজীবী ছেলে সুফিয়ানকে সঙ্গে নিয়ে গাড়িতে করে বাড়ি ফিরছিলেন। একটি রেলওয়ে আন্ডারপাসের কাছে তাঁদের গাড়ির পথ আটকে হামলাকারীরা প্রথমে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। পরে বাবা-ছেলেকে গাড়ি থেকে নামিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
নিহতদের পরিবারের অভিযোগ, এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে স্থানীয় তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। ঘটনার পর পুলিশ স্থানীয় হরনগর পঞ্চায়েতের তৃণমূল প্রধান ফাতেমা বিবি এবং তাঁর দুই সহযোগী সাহেব আলী মণ্ডল ও মিঠু শেখকে গ্রেপ্তার করে।
আদালতে তোলা হলে তিনজনের শারীরিক পরীক্ষার পর পুলিশ তাঁদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানায়। পরে আদালত তাঁদের নয় দিনের পুলিশি রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার অতুল ভি তিনজনের গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ কী এবং আরও কেউ এতে জড়িত কি না, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে সে বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা ঠিক হবে না বলে জানিয়েছেন তিনি।
পরপর এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ তুলছে। একই সময়ে রাজ্য বিধানসভার সাবেক ডেপুটি স্পিকার আশীষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আত্মহত্যার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।
একাধিক মৃত্যুর ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে সরাসরি কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। পুলিশ পৃথক ঘটনাগুলোর তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।