তাড়াহুড়ো নয়, সময় নিয়ে পুরো সংবিধান পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করেই সংবিধানে ১৮তম সংশোধনী আনতে চায় বর্তমান সরকার। সরকারের এমন বার্তা মাথায় রেখেই ধীরে ও সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। জুলাই জাতীয় সনদ ও বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারকে ভিত্তি ধরেই হবে এবারের সংশোধনী। সুপারিশ প্রণয়নের আগে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন অংশীজনেরও মতামত নেবে বিশেষ কমিটি। সব মিলিয়ে এ বছর সংবিধানে সংশোধনী আসার সম্ভাবনা কম।
চলতি ত্রয়োদশ সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করে জাতীয় সংসদ। কমিটি গঠনের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী এই কমিটির কার্যপরিধি হলো ‘সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনের নিমিত্ত সুপারিশ প্রণয়নপূর্বক সংসদে রিপোর্ট পেশ’। তবে, কতদিনের মধ্যে কমিটিকে সংসদে প্রতিবেদন দিতে হবে, সেটা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি।
১৩ জুলাই গঠনের পর বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক হয় গত ৪ আগস্ট। এটিই এখন পর্যন্ত একমাত্র বৈঠক। আগামী ২৭ আগস্ট শুরু হচ্ছে সংসদের তৃতীয় অধিবেশন। তৃতীয় অধিবেশনটি সাধারণত সংক্ষিপ্ত হয়ে থাকে। এরপর সংসদের চতুর্থ অধিবেশন বসবে নভেম্বরে। এর মধ্যে সুপারিশ চূড়ান্ত করে বিশেষ কমিটির তা সংসদে উপস্থাপনের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ফলে, সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনী যে আগামী বছরে গড়াচ্ছে তা মোটামুটি নিশ্চিত। আর সংশোধনী না আসা পর্যন্ত অনিষ্পন্ন থাকছে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো।
বিরোধী দল থেকে এই কমিটিতে পাঁচ জনের নাম দেওয়ার অনুরোধ করেছিল সরকারি দল। তবে কারো নাম দেয়নি বিরোধী দল। সংসদে এই কমিটি গঠনের দিনই তা প্রত্যাখ্যান করে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছিল বিরোধী দল। সেদিন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংসদে বলেছিলেন, এ ধরনের কমিটি গঠনের বিষয়ে তাদের ধারণাগত মতপার্থক্য আছে। সংশোধন নয়, তারা চান সংবিধান সংস্কার। অন্যদিকে, বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠকে অংশ নেননি কমিটির সদস্য ইসলামী আন্দোলনের সংসদ সদস্য মো. অলি উল্লাহ।
প্রথম বৈঠকের দিনে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো সংশোধনী প্রস্তাবে রাখার চেষ্টা করবে কমিটি। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে যে পাঁচটি নাম দেওয়ার কথা ছিল, একপর্যায়ে হয়তো তারা নাম দেবে। সেটা হলে তাদের সঙ্গেও আলোচনা হবে। এভাবে আমরা একটা গ্রহণযোগ্য সংশোধনী আনতে চাই এবং জনপ্রত্যাশা সবকিছু ধারণ করতে চাই। সবার সঙ্গে আলোচনা করেই রিপোর্টটা প্রণয়ন করতে চাই।’
জুলাই সনদে থাকা সংবিধান সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘৪৮টার মধ্যে অনেক কিছু আছে। আমরা অ্যাগ্রিড হয়েছি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদে। সেগুলো তো আমরা নেবই। আর যেগুলোতে আমরা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছি, সেগুলো নোট অব ডিসেন্ট আকারে নেব। এর বাইরে আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারে আছে। সেগুলো আমরা ধারণ করব।’
প্রথম বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানান, পুরো সংবিধানই পর্যালোচনা করতে হবে। কারণ, একটার সঙ্গে আরেকটার গাঁথুনি রাখতে হবে। জুলাই সনদের মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্টের বিষয়ে তিনি বলেন, জুলাই সনদেই সেটার ব্যাখ্যা দেওয়া আছে। কোনো জায়গায় যদি বিএনপি দ্বিমত পোষণ করে থাকে এবং সেই দ্বিমতের আলোকে যদি তার নির্বাচনি ইশতেহার অন্তর্ভুক্ত করা থাকে, তাহলে সেটা প্রিভেইল করবে। সেটাও কিন্তু জুলাই সনদেরই অংশ।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সনদের ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান-সম্পর্কিত। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে। দলটি নিজেদের ভিন্নমতের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী জোট সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের পক্ষে।
জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি প্রস্তাব বাস্তবায়নের প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবগুলোতে বিএনপির দেওয়া ভিন্নমত গুরুত্ব পায়নি। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় জাতীয় সংসদের নিয়মিত কাজের পাশাপাশি সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও কাজ করার কথা। তবে, বিএনপি ও তাদের জোট থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় পরিষদ গঠিত হয়নি। বিরোধী দলের সদস্যরা এ শপথ নিয়েছিলেন। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার নির্ধারিত সময় গত ১৫ মার্চ শেষ হয়েছে।
বিএনপির ইশতেহারে যা আছে
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ঘোষিত বিএনপির ইশতেহারের প্রথম অধ্যায়ের শিরোনাম ‘রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার’। এই অধ্যায়ের একটি অংশে ‘সাংবিধানিক সংস্কার’ শিরোনামে ৩৫টি প্রস্তাব রয়েছে। এসব প্রস্তাবের কয়েকটি জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও কিছু ক্ষেত্রে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে। এর মধ্যে একই ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী পদে থাকার পাশাপাশি দলীয় প্রধানের পদে থাকার সুযোগ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, উচ্চকক্ষের গঠনপ্রক্রিয়া, ক্ষমতাসহ কয়েকটি বিষয়ে বিএনপির অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।
বিএনপি ইশতেহারে বলেছে, ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সংবিধানে পুনঃস্থাপন করা হবে। বিএনপি সকল বিতর্কিত ও অগণতান্ত্রিক সাংবিধানিক সংশোধনী ও বিধানাবলি পর্যালোচনা ও পুনঃপরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার করবে। রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের লক্ষ্যে ৩১ দফার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার সাধন করা হবে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়গুলোও ইশতেহারে তুলে ধরা হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা
ইশতেহারে বিএনপি বলেছে, “বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় এবং স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্থায়ী সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে একটি ‘নির্বাচনকালীন দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা কেমন হবে, তা পরবর্তী সংসদে আলোচনা এবং স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। তবে বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বাইরে রাখতে চায় বিএনপি।”
ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় সব কটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে একমত হয়েছিল। কিন্তু, এর গঠনপ্রক্রিয়া কেমন হবে তা নিয়ে মতভিন্নতা ছিল। জুলাই সনদের প্রস্তাবের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে বেশ কয়েকটি স্তরের কথা বলা আছে। বিশেষ করে, প্রধান উপদেষ্টা বাছাই প্রক্রিয়ার কতগুলো ধাপের কথা বলা হয়েছে সনদে।
ক্ষমতার ভারসাম্য
বিএনপি তাদের ইশতেহারে বলেছে, ‘একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে যত মেয়াদ বা যতবারই হোক, তিনি সর্বোচ্চ ১০ বছর অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন ব্যক্তি একইসঙ্গে দলীয় প্রধানের পদেও অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন।’ ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনয়ন করা হবে’।
অন্যদিকে, ঐকমত্য কমিশন ক্ষমতার ভারসাম্য আনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সাংবিধানিক পদে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমানোর লক্ষ্যে এসব পদে নিয়োগের বিধান সংবিধানে যুক্ত করা এবং কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর পক্ষে ছিল। জুলাই সনদেও এর প্রতিফলন রয়েছে।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ
জুলাই সনদ ও বিএনপির ইশতেহার উভয় জায়গাতেই আইনসভাকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করার কথা বলা আছে। তবে, উচ্চকক্ষের গঠনপ্রক্রিয়া ও ক্ষমতা নিয়ে সনদের প্রস্তাবের সঙ্গে বিএনপির অবস্থানের ভিন্নতা আছে।
বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘সংবিধানের এককেন্দ্রিক চরিত্র অক্ষুণ্ন রেখে বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় সহযোগিতার লক্ষ্যে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি ও অন্যান্য পেশাজীবীদের সমন্বয়ে সংসদে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ প্রবর্তন করা হবে। রাজনৈতিক দলসমূহ নিম্নকক্ষের অর্জিত আসন সংখ্যার আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্ব করবে।’ তবে, সনদের প্রস্তাবে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টনের কথা আছে।