বছরে তিন মাস অতি উচ্চ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকতে পারেন বাংলাদেশের প্রবীণরা। কেবল বাংলাদেশ নয়, এই তালিকায় ভারত ও পাকিস্তানও রয়েছে। বয়সভেদে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়।
ভিন্ন বয়সি তিন ধরনের মানুষের ওপর ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উষ্ণায়নের একটি সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে দক্ষিণ এশিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলের মতো এলাকাগুলোর বয়স্কদের বছরে টানা তিন মাস দিনরাত অসহনীয় তাপমাত্রা সহ্য করতে হতে পারে। যেসব দেশে দারিদ্র্যের হার বেশি এবং ঘর ঠান্ডা রাখার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, গবেষণায় সেসব দেশকেই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই তালিকায় ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও নাইজারের মতো দেশও রয়েছে। দ্য ল্যানসেট প্ল্যানেটারি হেলথ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি বয়স্কদের স্বাস্থ্যের জন্য প্রচলিত ধারণার চেয়ে বেশি ঝুঁকি তৈরি করছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নেতৃত্বে করা এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলো এমন এক সময়, যখন উত্তর গোলার্ধে তীব্র দাবদাহ চলছে, দাবদাহজনিত কারণে মৃত্যু হয়েছে অনেক মানুষের।
এ ধরনের গবেষণায় আগে ‘ওয়েট-বাল্ব তাপমাত্রা’ নামের একটি পরিমাপ-পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো। তাতে আর্দ্রতা বিবেচনায় নিয়ে দেখা হতো মানবদেহ তাপ কতটা সহ্য করতে পারে। তবে দ্য ল্যানসেট প্ল্যানেটারি হেলথ-এ প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের গবেষণাগুলো চালানো হয়েছিল মূলত তরুণ ও সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর। তার মানে, বয়স্কদের ঘাম কম হওয়া, হূদ্যন্ত্র তুলনামূলকভাবে দুর্বল হওয়া এবং আগে থেকেই নানা ধরনের শারীরিক অসুস্থতা থাকার বিষয়গুলো আগের গবেষণায় পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি। তাই যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা সাম্প্রতিক কালে পরিচালিত ওয়েট-বাল্ব পরীক্ষায় ৬০ বছরের বেশি বয়সি মানুষের ওপর উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার প্রভাবজনিত তথ্যগুলো ব্যবহার করেছেন। তা করতে গিয়ে সারা বিশ্বের বয়স্ক জনগোষ্ঠীকে বিবেচনায় নিয়েছেন গবেষকরা। বিভিন্ন মাত্রার বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রেক্ষাপটে ২১০০ সাল নাগাদ তিনটি ভিন্ন বয়সের মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর তাপের প্রভাব কেমন হবে তার একটি মডেল তৈরি করেছেন তারা। গবেষণা প্রতিবেদনের উপসংহারে তারা বলেছেন, অসহনীয় তাপমাত্রা অনেক বড় পরিসরে এবং দীর্ঘ সময় ধরে অনুভূত হবে। এর ফলে আগে যতটা ধারণা করা হতো, তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাক-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় বিশ্বের তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বিশ্ব জুড়ে ৬০ বছরের বেশি বয়সি ২২ শতাংশ মানুষ প্রতি বছর অন্তত এক মাস ধরে অসহনীয় তাপমাত্রা সহ্য করতে বাধ্য হবেন।
তাপমাত্রা এক ডিগ্রি করে বাড়লে আরো ১০০ কোটি মানুষ এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন এবং সেরকম পরিস্থিতিতে তাদের শরীর স্বাভাবিক অবস্থায় যতটা তাপ ও আর্দ্রতা সহ্য করতে পারে, তার চেয়ে বেশি তাপ ও আর্দ্রতার মধ্যে আরো প্রায় এক মাস কাটাতে হবে তাদের। এমন পরিস্থিতি এড়াতে তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখা গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসারণ কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন গবেষকরা। এর পাশাপাশি ভবিষ্যতে তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় বয়স্ক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার অগ্রাধিকার নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। দেখা গেছে, তাপজনিত কারণে বেশির ভাগ মৃত্যু হয় ঘরের ভেতরে। তাই বিজ্ঞানীরা মনে কনেন, এয়ার-কন্ডিশনিং এবং ঘর ঠান্ডা রাখার অন্যান্য ব্যবস্থার সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। —ডয়চেভেলে

