ঠান্ডা ম্যাকাইয়ে গরম হয়ে উঠছে সিরিজ, অচেনা পিচে ইতিহাস খুঁজবে বাংলাদেশ

ডারউইনের গরম পেরিয়ে ম্যাকাইয়ের ঠান্ডা বাতাসে এখন অন্য এক বাংলাদেশ। কয়েক দিন আগেও যে দল অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের আনন্দে ভাসছিল, সেই দলই এখন আরও বড় এক সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে। সামনে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট। ২২ আগস্ট থেকে গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায় যে লাল বল গড়াবে, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি শহরের প্রথম টেস্ট, একটি মাঠের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান এবং বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে নতুন কিছু করে ফেলার সুযোগ। ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সেটি ছিল বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়।

এখন সমীকরণ খুব সরল। ম্যাকাইয়ে হার এড়াতে পারলেই সিরিজ বাংলাদেশের। জয় এলে ইতিহাসের সেই অধ্যায় আরও উজ্জ্বল হবে। আর অস্ট্রেলিয়ার জন্য ম্যাচটি বাঁচা-মরার। সিরিজ সমতায় ফেরাতে হলে প্যাট কামিন্সের দলকে জিততেই হবে। মঙ্গলবার রাতে প্রায় ১৪ ঘণ্টায় কুইন্সল্যান্ডের এই শহরে পৌঁছেছে বাংলাদেশ দল। 

দীর্ঘ ভ্রমণের ধকলের কারণে অনুশীলনেও পরিবর্তন আনতে হয়েছে। গতকাল দল বিশ্রামে ছিল। প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনুশীলন হওয়ার কথা আজ। অস্ট্রেলিয়া দলও ডারউইনের পর ম্যাকাইয়ে এসেছে। শহরটি যেন নিজের প্রথম টেস্টকে স্বাগত জানাতে দুই দলকেই একই সঙ্গে বরণ করে নিয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের আগ্রহ ছিল। সাধারণ যাত্রীরাও ক্রিকেটারদের দেখতে ভিড় করেছেন।

গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনার বয়স ৭৮ বছর। ১৯৪৮ সালে মাঠটির যাত্রা শুরু হয়েছিল রে মিচেল ওভাল নামে। পরে এটি পরিচিত হয়েছে হারাপ পার্ক নামেও। ২০১৮ সালে প্রধান মাঠটির নামকরণ করা হয় গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনা। এত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখানে পুরুষদের টেস্ট ক্রিকেট আসেনি। এবার সেই অপেক্ষার অবসান। ২২ আগস্ট বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচ দিয়েই মাঠটি টেস্ট ভেন্যু হিসেবে অভিষিক্ত হবে। অস্ট্রেলিয়ার ১২তম পুরুষদের টেস্ট ভেন্যু হিসেবে নাম উঠবে এর। 

অস্ট্রেলিয়া অবশ্য ম্যাকাইয়ের সঙ্গে পুরোপুরি অপরিচিত নয়। ২০২৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে এখানে দুটি ওয়ানডে খেলেছে তারা। টেস্টের সঙ্গে অবশ্য ওয়ানডের কোনো সরল তুলনা চলে না। পাঁচ দিনের ক্রিকেটে উইকেটের চরিত্র বদলায়। নতুন বলের আচরণ বদলায়। শরীরের ক্লান্তি বাড়ে। বাতাসের প্রভাবও বদলে যেতে পারে। ম্যাচ যত এগোবে, উইকেটের চরিত্রও বদলাতে পারে। শেষ দিকে স্পিনারদের ভূমিকা বাড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অর্থাৎ ম্যাকাইয়ের আসল রহস্য হয়তো প্রথম বলেই প্রকাশ পাবে না। পাঁচ দিনে ধীরে ধীরে তার চরিত্র বদলাবে।

এই জায়গাতেই বাংলাদেশের সামনে ডারউইনের চেয়ে আলাদা পরীক্ষা। ডারউইনে ছিল উষ্ণতা ও আর্দ্রতা। ম্যাকাইয়ে আবহাওয়া অনেক শীতল। আগস্টে ডারউইনের দিনের তাপমাত্রা সাধারণত ৩০ ডিগ্রির ওপরে থাকে। ম্যাকাইয়ে একই সময়ে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা সাধারণত প্রায় ২০ ডিগ্রির ঘরে থাকে। রাত আরও ঠান্ডা। স্থানীয় আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যানেও আগস্টে ম্যাকাইয়ের গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন প্রায় ১৪ ডিগ্রির কাছাকাছি। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্য তাই ডারউইনের পরিচিত গরম থেকে একেবারে ভিন্ন পরিবেশ অপেক্ষা করছে।

তবে বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির খবর শরীফুল ইসলামের ফেরা। হ্যামস্ট্রিং চোটের কারণে প্রথম টেস্টে ছিলেন না বাঁহাতি এই পেসার। চোট কাটিয়ে তিনি এখন দ্বিতীয় টেস্টের আগে দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। প্রথম টেস্টে না থাকাকে দুর্ভাগ্য মনে করেন কি না, এমন প্রশ্নে শরীফুলের উত্তরও ছিল সহজ। তার মতে, যা ঘটে তা মঙ্গলের জন্যই হয়। চোটের কারণে বিশ্রাম ও পুনর্বাসনের সময় পেয়েছেন। এখন তার লক্ষ্য দলের জয়ের ধারাটা ধরে রাখা। ডারউনের জয় তিনি বাইরে থেকে দেখেছেন। 

মাঠে না থাকলেও সেই জয়ের অংশ হতে পেরে তার আনন্দের কমতি নেই। তিনি বলেছেন, দলের কেউ ভালো করলে তার ভালো লাগে। তবে পুরো দল তিন বিভাগে একসঙ্গে ভালো করলে আনন্দ আরও বেশি। কারণ তার কাছে বাংলাদেশ একটি ইউনিট। সেই ইউনিটেরই এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য সিরিজ জয়। শরীফুলের মুখে সিরিজ জয়ের কথাটিও এসেছে সরাসরি। কোনো দলই সিরিজ না জিতে ফিরতে চায় না। বাংলাদেশও চায়। ম্যাকাইয়ে সেই সুযোগ এখন তাদের হাতের মুঠোয়।

বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা যে আবহাওয়ায় বড় হয়েছেন, ম্যাকাই তার চেয়ে অনেক আলাদা। আবার অস্ট্রেলিয়ার খেলোয়াড়দের জন্যও মাঠটি পুরোপুরি পরিচিত নয়। তাই কন্ডিশনের সুবিধা কে কতটা দ্রুত নিতে পারে, সেটিই হতে পারে ম্যাচের প্রথম বড় লড়াই। বাংলাদেশের জন্য ম্যাকাইয়ের সকালগুলো ইতিমধ্যেই কিছু গল্প তৈরি করেছে। স্থানীয় একটি ফিটনেস ও হেলথ ক্লাবে অনুশীলন করেছে বাংলাদেশ দল। একই জায়গায় জিম করতে এসেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার জশ হ্যাজলউড, স্কট বোল্যান্ড ও জশ ইংলিস। ম্যাকাইয়ের ক্রিকেটজীবনে এই দৃশ্যও নতুন। একই শহরের একই জিমে একসঙ্গে দুই দলের ক্রিকেটার। বাইরে থেকে দেখলে স্বাভাবিক। কিন্তু সামনে থাকা টেস্টের গুরুত্বের কথা ভাবলে দৃশ্যটির আলাদা তাৎপর্য আছে।

ক্রিকেটে কন্ডিশন কখনো এক দলের জন্য পুরোপুরি লেখা থাকে না। অস্ট্রেলিয়ার জন্যও ম্যাকাই একটি পরীক্ষা। তারা ডারউইনে হেরেছে। কিন্তু নিজেদের দেশে পরপর দুই টেস্টে হারের অভিজ্ঞতা তাদের নেই বললেই চলে। বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জটি পরিষ্কার। অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণকে সামলাতে হবে। তারপর অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংকে আবার চাপে রাখতে হবে। এরপর ম্যাচ যত এগোবে, মিরাজ ও তাইজুলের মতো স্পিনারদের জন্য দরজা খুলতে হবে। অর্থাৎ ডারউইনের মতোই তিন বিভাগে দলগত পারফরম্যান্স দরকার। কোনো একটি বিভাগ একা সিরিজ জেতাতে পারবে না।