শীর্ষ এক সন্ত্রাসীর নাম ব্যবহার করে চাওয়া হয়েছিল ১৫ হাজার ডলারের বিশাল অঙ্কের চাঁদা। শুরুতে বিষয়টিকে নিছকই কোনো প্রতারক চক্রের ভুয়া বার্তা ভেবে এড়িয়ে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু চাঁদা পরিশোধের সময়সীমা পার হতেই মাঝরাস্তায় পথ আটকে চালানো হলো ভয়াবহ হামলা।
শুধু তাই নয়, রক্তাক্ত হওয়ার পরপরই সেই একই নম্বর থেকে আবার উপহাসমূলক বার্তা এল—‘হাউ ডু ইউ ফিল নাও’ (এখন কেমন লাগছে)! এভাবেই চাঞ্চল্যকর এক হামলার শিকার হয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নাক কান গলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আসাদুর রহমান।
৫৫ বছর বয়সী এই জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক বর্তমানে নিজের কর্মস্থল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হামলায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে তার ডান চোখটি লাল হয়ে ফুলে আছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এই রোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি জানান, কিছুদিন আগে চট্টগ্রামের একসময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের নাম ব্যবহার করে তার কাছে ১৫ হাজার ডলার চাঁদা চেয়ে একটি মেসেজ আসে। সেখানে চাঁদা দেওয়ার জন্য ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল।
ডা. আসাদুর রহমান জানান, নির্দিষ্ট সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার ঠিক দুই দিন পর, অর্থাৎ ১৭ আগস্ট রাতে তিনি এই হামলার শিকার হন। সেদিন পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নিজ চেম্বার থেকে কাজ শেষে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে ফিরছিলেন তিনি। সিএনজি অটোরিকশাটি রাজধানীর শান্তিনগর এলাকায় পৌঁছালে হঠাৎ চারজন ব্যক্তি পথ আটকে দাঁড়ায়।
হামলাকারীরা সিএনজির দরজা খুলতে জোরাজুরি করতে থাকে। চিকিৎসক বারবার নিষেধ করলেও একপর্যায়ে চালক দরজাটি খুলে দেন। এরপর দুর্বৃত্তরা তাকে বেধড়ক মারধর শুরু করে। মারধরের সময় তারা অভিযোগ করে যে, এই চিকিৎসক তাদের একজনের বোনের ভুল চিকিৎসা করেছেন। তবে ওই রোগী কে বা তার বিস্তারিত পরিচয় জানতে চাইলে হামলাকারীরা কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি।
ঘটনার সময় আশপাশের স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এসে একজনকে হাতেনাতে ধরে ফেলে এবং পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পরে জানা যায়, আটক হওয়া ওই যুবকের বাড়ি চিকিৎসকের নিজ এলাকা লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে। পুলিশের কাছে ওই যুবক স্বীকার করেছে যে, কেউ একজন তাকে প্রলোভন দেখিয়েছিল—এই চিকিৎসকের অনেক টাকা আছে, তাদের সঙ্গে গেলে তাকে একটি মুঠোফোন কিনে দেওয়া হবে। রোগীর ভুল চিকিৎসার বিষয়ে সে কিছুই বলতে পারেনি।
হামলার এখানেই শেষ নয়। ডা. আসাদুর রহমান জানান, মারধরের প্রায় এক ঘণ্টা পর ওই একই নম্বর থেকে তার কাছে একটি খুদে বার্তা আসে, যেখানে লেখা ছিল, ‘হাউ ডু ইউ ফিল নাও’। পরদিন তাকে আরও দুটি বার্তা পাঠানো হয়। সেখানে হুমকি দিয়ে বলা হয়, ‘তুমি কি আরও ঝামেলা করতে চাও?’ এবং ‘তোমার কাছে কি আমরা মিডিয়ার লোকজন পাঠাব?’
এ ঘটনায় ইতিমধ্যে রাজধানীর পল্টন থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী এই চিকিৎসক। তবে মামলার এজাহারে ১৫ হাজার ডলার চাঁদা দাবির কথা উল্লেখ থাকলেও, শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের নাম বা হামলার পরে আসা হুমকিবার্তার বিষয়গুলো যুক্ত করা হয়নি।
মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে পল্টন থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে এটিকে পূর্বশত্রুতার জের বলেই মনে হচ্ছে। জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলে ঘটনার পেছনের আসল উদ্দেশ্য পরিষ্কার হবে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে আটক হওয়া ‘জীবন’ নামের ওই যুবককে জিজ্ঞাসাবাদ ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় হামলায় জড়িত আরও একজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
তবে বর্তমান থানা-পুলিশের তদন্ত কার্যক্রমে মোটেও সন্তুষ্ট নন ডা. আসাদুর রহমান। তিনি জানিয়েছেন, সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনতে মামলাটি অবিলম্বে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তরের জোর দাবি জানাছেন তিনি।