আসছে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা

উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা চ্যালেঞ্জ হতে পারে

উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যকে সামনে রেখে আসছে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকে সাজানো হচ্ছে। চলতি অর্থবছর (২০১৯-২০২০) সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের শেষ বছর। আগামী ২০২০-২০২১ অর্থবছর থেকে শুরু হচ্ছে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রথম বছর। এবারের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পাকে ২০৪১ সালে উন্নত দেশে উপনীত হওয়ার ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করানো হবে। শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘ত্বরান্বিত সমৃদ্ধি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি’। পরিকল্পনায় নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের রূপরেখা থাকবে বলে জানা গেছে। তবে বিশাল শ্রমশক্তির জন্য উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সর্বপ্রথম চ্যালেঞ্জ হতে পারে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম ইত্তেফাককে বলেন, রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত চারটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ধারাবাহিকতার প্রথম পরিকল্পনা হবে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। চলমান সপ্তম পরিকল্পনার অধীনে অগ্রগতির ঘাটতি ও নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হবে এতে। সেই সাথে রূপকল্প ২০৪১ এর পথ অনুসরণ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। প্রযুক্তির পরিবর্তন এবং দক্ষতার সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করার মাধ্যমে দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টির চ্যালেঞ্জসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

উল্লেখ্য, নির্বাচনী ইশতেহারের প্রধান অঙ্গীকার ছিল ‘আমার গ্রাম-আমার শহর’। অর্থাত্ প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণ করা। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় উত্পাদন বৈচিত্র্যের মাধ্যমে কৃষির উত্পাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নগরায়ণের কারণে জমির পরিমাণ ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। তাই গবেষণা, সম্প্রসারণ ও কৃষি খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে ভূমির উত্পাদনশীলতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

নির্বাচনী ইশতেহারের দ্বিতীয় প্রধান বিষয় হলো ‘তরুণ প্রজন্ম : যুব শক্তি, বাংলাদেশের সমৃদ্ধি’ যা উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ায় তরুণদের কাজে লাগানো বোঝায়। বাংলাদেশে জনসংখ্যাতাত্ত্বিক রূপরেখা দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। নির্ভরতা হার যথেষ্ট পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে এবং কর্মক্ষম জনসংখ্যার পরিমাণ বাড়ছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের নিয়োগযোগ্য কর্ম শক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। সেইসাথে জনসংখ্যাতাত্ত্বিক লভ্যাংশকে (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) কাজে লাগানো প্রয়োজন। এর পাশাপাশি বয়স্ক জনসংখ্যার পরিমাণ বাড়ছে যেখানে স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। ড. শামসুল আলম বলেন, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এই চ্যালেঞ্জ বিশ্লেষণ করা হবে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দুটি বিষয় প্রস্তাব করা হয়েছে। একটি হলো ত্বরান্বিত সমৃদ্ধি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি। অর্থাত্ বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ১০ শতাংশে উন্নীত করা এবং এই প্রবৃদ্ধির সুবিধাগুলো যাতে সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছানো যায় তার সুপারিশ করা। তিনি জানান, উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং সুষম আয় বণ্টন দারিদ্র্য হ্রাসের গতিশীলতা বাড়বে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তির উন্নত এবং সরকারি নীতি, প্রতিষ্ঠান, কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব আরো করা হবে যেটি আয় বৈষম্য কমিয়ে আনতে সহায়তা করবে। আয় বৈষম্য হ্রাস করার সহজ চ্যালেঞ্জ নয়, তবে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আগামী জানুয়ারি মাসে পরিকল্পনার খসড়া প্রকাশ করা হবে।

পরিকল্পনার ধারণাপত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে দুই অঙ্কের টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে ম্যানুফ্যকচারিং খাতে ১৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন এবং কাঙ্ক্ষিত কাঠামোগত রূপান্তর অর্জনের জন্য আধুনিক পরিষেবার মান আরো বাড়ানো প্রয়োজন। কাঠামোগত পরিবর্তন এবং অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কতিপয় সীমাবদ্ধতা এবং চ্যালেঞ্জ শনাক্ত করা প্রয়োজন। বেসরকারি বিনিয়োগে মন্দাভাব প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা স্বরূপ। ষষ্ঠ এবং সপ্তম পরিকল্পনায় বেসরকারি বিনিয়োগকে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে এবং সেই সাথে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত বেসরকারি বিনিয়োগ হার জিডিপির ২২ শতাংশ থেকে ৩২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে হবে।

তবে বিশ্লেষণে দেখা যায় বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র ২৩ ভাগ। এই মন্দাভাব কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকারি বিনিয়োগ হার বৃদ্ধি করা হলেও সামগ্রিক বিনিয়োগ প্রচেষ্টা ৯ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়। পরিকল্পনায় শহরে জীবন মানের উন্নয়নে কৌশলগত নীতিমালা, কর্মসূচি ছাড়াও মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে জোর দেওয়া হচ্ছে। টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার পাশাপাশি, জাতিগতভাবে সংখ্যালঘু, প্রান্তিক এবং প্রতিবন্ধীদের ক্ষমতায়ন, নারী ক্ষমতায়নের উত্সাহ প্রদানের বিষয়গুলো গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।