গরুর মূল্য বৃদ্ধি পেলে মাংসের মূল্য বৃদ্ধি পায়। সেইসঙ্গে চামড়ার মূল্যও বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের দেশে গত চার বছর ধরে গরুর মাংসের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। চামড়া রপ্তানির আয় বেড়েছে গত দুই দশক ধরে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে কাঁচা চামড়ার মূল্য হ্রাস পাচ্ছে অবিরাম। এটা এক ধরনের অসংগতি। কোরবানির ঈদের সময় গরুর চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তখন গরুর দামও বেড়ে যায় শহরে ও গ্রামে। কিন্তু চামড়ার দামে বরাবরই ধস নামে। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের এতিম ও মিসকিন। প্রাপ্ত অর্থ কম হয় বলে নিদারুণভাবে ঠকে গ্রামের হতদরিদ্র মানুষগুলো।
২০১৩ সালে গরুর মাংসের দাম ছিল কেজি প্রতি ১৮০ টাকা। ২০১৪ সালে ভারতীয় গরু আমদানি হ্রাসের কারণে তা বেড়ে যায় ৩০০ টাকায়। ২০১৫ সালে তা আরো বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ৪০০ টাকায়। ২০১৬ সালে ঈদের আগে পুনরায় বেড়ে যায় গরুর মাংসের দাম। প্রতি কেজি বিক্রি হয় ৪৫০ টাকা দরে। ২০১৭ সালে ৪৮০ এবং ২০১৮ সালে ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হয় প্রতি কেজি গরুর মাংস। এবার ঈদের আগে তা বেড়ে যায় ৫৪০ টাকায়। তাতে সাধারণ ভোক্তা ও গরিব মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের আমিষ গ্রহণের পরিমাণ হ্রাস পায়। বৃদ্ধি পায় তাদের পুষ্টিহীনতা।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক কালে দেশের অভ্যন্তরে কাঁচা চামড়ার মূল্য ক্রমাগতভাবে হ্রাস পাচ্ছে। ২০১৩ সালে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ছিল ৮৫ থেকে ৯০ টাকা। খাসির চামড়ার দাম ছিল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। ২০১৪ সালে গরুর চামড়ার দাম ৭০ থেকে ৭৫ টাকায় এবং খাসির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় হ্রাস পায়। ২০১৫ সালে এর ইউনিট মূল্য আরো হ্রাস পেয়ে গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৫০ থেকে ৫৫ টাকা এবং খাসির চামড়া ২০ থেকে ২২ টাকায় এসে দাঁড়ায়। এবার তা আরো হ্রাস পেয়ে গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট দাঁড়ায় ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। সারাদেশে খাসির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় প্রতি বর্গফুট ১৩ থেকে ১৫ টাকা। সে হিসেবে কোরবানির গরুর প্রতিটি চামড়া মৌসুমি ব্যবসায়ীদের খরচ ও লাভের অঙ্ক বাদ দিয়ে ৭০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা হওয়া উচিত। কিন্তু তা বিক্রি হয়েছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছেন, সিন্ডিকেটের কারণেই বাজারের এ অবস্থা। অবশ্য গত দুই বছর ধরেই বাজার নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেটের কারসাজির অভিযোগ ছিল। কিন্তু এবারের অবস্থা খুবই শোচনীয়। বিক্রি করতে না পেরে দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেকে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন। পানিতে ফেলে দিয়েছেন অনেকে। ব্যাপক দরপতন ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে সংরক্ষিত পচে যাওয়া চামড়া গাড়ি ও ট্রাকে করে সরিয়ে দিয়েছে সিটি করপোরেশনগুলো। বিক্রি করতে না পেরে বিভিন্ন স্থানে সড়কে চামড়া ফেলে প্রতিবাদ জানিয়েছে চামড়া উত্পাদনকারী কৃষক ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। অনেক সময় কোরবানির চামড়া সরাসরি বিক্রি না করে তা দান করে দেওয়া হয় বিভিন্ন মাদ্রাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিং-এ বসবাসকারী গরিব-দুস্থদের। এবার চামড়ার দামে ধস নামায় ওরাও বঞ্চিত হয়েছে সেই সুবিধা থেকে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ চামড়া কম সংগৃহীত হয়েছে। এটা দেশের ক্ষতি।
আমাদের অর্থনীতিতে একটা গুরুত্বপূর্ণ খাত চামড়া শিল্প। এ শিল্পের অধীনে আছে ২২০টি ট্যানারি। অসংখ্য জুতা, ব্যাগ, বেল্ট ও সুদর্শন সরঞ্জামাদি তৈরির কারখানা। তাতে সরাসরিভাবে নিয়োজিত রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কর্মচারী। স্থূল দেশজ আয়ে (জিডিপিতে) চামড়াশিল্পের অবদান ০.৪০ শতাংশ। মোট রপ্তানি আয়ে এ খাতের অবদান সাড়ে ৩ শতাংশ। তৈরি পোশাকশিল্পের পর রপ্তানি আয় অর্জনের ক্ষেত্রে এ খাতের স্থান দ্বিতীয়। বছরের পর বছর এ খাতের রপ্তানি আয় বাড়ছে। কিন্তু চামড়া উত্পাদনকারী কৃষক, প্রান্তজন, এতিম ও মিসকিন বাড়তি রপ্তানি আয়ের ন্যায়সংগত হিস্যা পাচ্ছে না।
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুসারে ২০০২-২০০৩ সালে এদেশে চামড়া রপ্তানির আয় ছিল ২২৯.৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১১-২০১২ সালে তা ৫২৫.৮, ২০১২-২০১৩ সালে ৬৯২.৬, ২০১৩-২০১৪ সালে ১০০৭.০, ২০১৪-১৫ সালে ১১৩০.৫ এবং ২০১৫-২০১৬ সালে তা ১১৬০.৯ মিলিয়ন ডলারে বৃদ্ধি পায়। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে এই আয়ের পরিমাণ আরো বেড়ে হয় ১২৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার বা ১২৩৪ মিলিয়ন ডলার। তবে গত বছর তা কিছুটা হ্রাস পায়। আমাদের চামড়া শিল্পের পরিবেশগত সনদ ঠিক না থাকা, ফিনিশড চামড়া আমদানি বেড়ে যাওয়া এবং সিনথেটিকের ব্যবহার বৃদ্ধি এর প্রধান কারণ বলে অনেকে মনে করছেন। তবে তা খতিয়ে দেখার বিষয়।
ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ সূত্রে প্রকাশ, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দরপতন হয়েছে। তাছাড়া গত বছরের কেনা চামড়ার বহুলাংশ এখনো মজুদ রয়ে গেছে। তাছাড়া প্রয়োজনীয় ঋণপ্রাপ্তিতে ছিল সমস্যা। ফলে তাদের আছে অর্থ সংকট। আড়তদারদের দাবি, ট্যানারি মালিকরা গত বছরের বকেয়া পরিশোধ না করায় (যার পরিমাণ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা) তারা চামড়া কিনতে পারছে না। ফলে এই দরপতন ঘটেছে। অন্যদিকে ট্যানারি মালিকরা বলছেন, কোরবানির কাঁচা চামড়ার মূল্য কমিয়ে ফায়দা লুটেছেন আড়তদাররা। তারা কম দামে চামড়া কিনলেও ট্যানারিতে সরকার নির্ধারিত দামেই বিক্রি করবেন। এই পরস্পর দোষারোপের ফলে কাঁচা চামড়া নিয়ে সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে। তাতে নেতিবাচক খবর গেছে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছে। তারা উপযুক্ত দামে চামড়া ক্রয়ে অনীহা দেখিয়েছে। ফলে ধস নেমেছে চামড়ার দামে। এভাবে পুরো স্থানীয় বাণিজ্যে কম দামে চামড়া কেনার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে ট্যানারি মালিকদের অনাগ্রহ ও আড়তদারদের কারসাজি। তাদের মধ্যে পারস্পরিক যুগসূত্র থাকাও অসম্ভব কিছু নয়। বিষয়টি ভালোভাবে তদন্ত করে দায়দায়িত্ব নিরূপণ করা উচিত।
ইতোমধ্যেই চামড়ার মালিক সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে চামড়া ক্রয়ের কথা; কিন্তু ততক্ষণে চামড়াগুলো কৃষকদের হাত ছাড়া হয়ে গেছে। এখন মূল্য বৃদ্ধি পেলেও গ্রামের হতদরিদ্র মানুষ, এতিম ও মিসকিনগণ তাতে আর লাভবান হওয়ার সুযোগ নেই। এরই মধ্যে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনিশ চামড়ার দামে ধস ঠেকাতে কাঁচা চামড়া রপ্তানির সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। অবশ্য ট্যানারি মালিকরা এ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি করেছেন। বাংলাদেশ থেকে ইতিপূর্বে কাঁচা চামড়া রপ্তানি হতো; কিন্তু পরে ট্যানারির মালিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তা বন্ধ করা হয়। বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরে চামড়া মূল্যে ধস এবং পচন ও পুঁতে ফেলাজনিত লোকসান ঠেকাতে কাঁচা চামড়া রপ্তানি একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বাংলাদেশের ট্যানারি কারখানাগুলো এখন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে ঢাকা শহরের হাজারিবাগে স্থাপিত ট্যানারিগুলো সাভারস্থ ট্যানারি শিল্প নগরীতে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। তাতে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে ট্যানারি শিল্প, উন্নত হবে পরিবেশ। তবে সাভারের শিল্পনগরী এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। স্থানান্তর হওয়া ১৫৪টি কারখানার ৩৪টি এখনো উত্পাদনে যেতে পারেনি। আর যে ১২০টি উত্পাদনে আছে, সেগুলোও পুরোদমে উত্পাদন করতে পারছে না। তাছাড়া কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে আমরা বাজার হারাচ্ছি। অদূর ভবিষ্যতে সাভারের শিল্পনগরী শতভাগ চালু এবং কেন্দ্রীয় শোধনাগার (সিইটিপি) ও ডাম্পিংসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সুসম্পন্ন করতে হবে। কারখানার মালিকদেরকে প্লটের দলিল বুঝিয়ে দিতে হবে। প্রয়োজনীয় ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে ট্যানারির মালিকদের জন্য। পাশাপাশি কাঁচা চামড়া রপ্তানির দুয়ার উন্মুক্ত করতে হবে সাময়িকভাবে। তাতে ভবিষ্যতে চামড়ার দরপতন ঠেকানো এবং হতদরিদ্র মানুষের হিস্যা কেড়ে নেওয়ার অনৈতিক প্রচেষ্টা রুখে দেওয়া সম্ভব হবে।
সর্বশেষ খবর অনুযায়ী গতকাল উদভূত পরিস্থিতিতে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ বছর কোরবানির চামড়া নিয়ে যে সংকট দেখা দিয়েছে, অচিরেই তার অবসান হবে বলে আমরা আশা করি।
n লেখক : কৃষি অর্থনীতিবিদ এবং সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতি