বর্তমানে উন্নয়নকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে অপরিকল্পিতভাবে তৈরি হচ্ছে শিল্প-কারখানা ও বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান। যার কারণে ধ্বংস করা হচ্ছে বিস্তৃত বনভূমি। এতে সহজে হারিয়ে যাচ্ছে বৈচিত্র্য, বন্য প্রাণী ও মহামূল্যবান গাছগাছালি। বনভূমি উজাড়ের ফলে বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। কিছু কিছু প্রাণী পশুশিকারির কবলে পড়ছে। অনেক প্রাণী জীবন বাঁচাতে ভারতের বনাঞ্চলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে। আবার পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য ২৫ শতাংশ বনাভূমি দরকার। সেই জায়গায় সরকারি হিসাব মতে বনভূমির পরিমাণ ১৭ শতাংশ। কিন্তু ইউনেস্কোর মতে, বনভূমির পরিমাণ ১০ শতাংশ। তবে আর যা-ই হোক, দিন দিন যে এর পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এতে বড় হুমকির মুখে পড়ছে পরিবেশের ভারসাম্য।
প্রকৃতির সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণের জন্য শুধু যে শিল্পায়ন দায়ী— তা নয়। এর পেছনে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত দালানকোঠা ও ইটভাটা তৈরিও অন্যতম কারণ। বর্তমান দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৩৭ শতাংশ। অর্থাত্ একদিকে জনসংখ্যা প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরদিকে বসতবাড়ি, খাদ্যসহ বিভিন্ন চাহিদা দিন দিন বাড়ছে কিন্তু সম্প্রসারণ হচ্ছে না ফসলি জমির পরিমাণ। বাড়তি জনসংখ্যার চাপে প্রতি বছর হারিয়ে যাচ্ছে ৮০ হাজার ৩০০ হেক্টর ফসলি জমি। অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে বাধ্য হয়ে মানুষ পাহাড় ও বনাঞ্চল কেটে তৈরি করছে বসতবাড়ি এবং আবাদি জমি। আবার অতিরিক্ত দালানকোঠার জন্য প্রয়োজন অতিরিক্ত ইট। আর ইটের চাহিদা মেটানোর জন্য ব্যাঙের ছাতার মতো তৈরি হচ্ছে ইটভাটা। যার ফলে সাধারণ জমি হারাচ্ছে উর্বরতা এবং মাটির চাহিদার জন্য কাটা হচ্ছে বড়ো বড়ো পাহাড়; যা পরিবেশের জন্য বড়ো হুমকি।
বর্তমান জলবায়ু বৈশ্বিক আলোচিত বিষয়। বিশ্বে দিন দিন উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেইসঙ্গে বরফ গলে বড়ো ঝুঁকির মুখে পড়ছে সাগরপারের দেশগুলো। বিশ্বের মধ্যে এশিয়া মহাদেশে জলবায়ুর প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ শীর্ষে। এছাড়া মালদ্বীপ, ভুটান, শ্রীলঙ্কা অন্যতম। বাংলাদেশের উপকূলে প্রতি বছর ১৪ মিলিমিটার করে সমুদ্রের পানি বাড়ছে। ২০ বছরে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে ২৮ সেন্টিমিটার। বর্তমান সমুদ্রের পানি যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে আগামী একদশকে বাংলাদেশে ১৭ শতাংশ সমুদ্র বিলীন হয়ে যাবে। ক্রিশ্চিয়ান পেনেনটি দীর্ঘ গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, ২০৫০ সালের মধ্যেই ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হবে। তার প্রমাণ মেলে, ২০০৫ সালে জলবায়ুর কারণে উদ্বাস্তু হয়ে ভোলার চরাঞ্চল থেকে পাঁচ লাখ মানুষ অন্য জায়গায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল।
বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে শুধু যে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা নয়, বরং বিশ্ব ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। ইতিমধ্যে আফ্রিকা মহাদেশের অনেক দেশ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়েছে, ব্রাজিলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও যুক্তরাষ্ট্রে ঘন ঘন জলোচ্ছ্বাস দেখা দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আগামী এক দশকের মধ্যে বিশ্বের অনেক দেশ তীব্র খাদ্যসংকটের পরবে বলে আশঙ্কা করছে জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। বর্তমান ইউরোপের অনেক দেশে অতিশয় তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে রেড এলার্ট জারি করেছে। যার ফলে সাধারণ জীবনযাপনের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এমনি অতি তাপমাত্রা বৃদ্ধি কারণে বিভিন্ন ধরনের নতুন নতুন রোগের আবির্ভাব ঘটছে।
ক্রিশ্চিয়ান পেনেটি উল্লেখ করেছেন জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ৩০০ মিলিয়ন লোক ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যাতে প্রতি বছর মারা যাবে প্রায় ৩ লাখ মানুষ। বছরে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৬০০ বিলিয়ন ডলার। জলবায়ুতে বাস্তুহারা হবে লাখ লাখ মানুষ। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল আর্থ সায়েন্সের মতো, ২০৫০ সাল নাগাদ জলবায়ু শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়াবে ৭০০ মিলিয়ন। সুতরাং প্রকৃতির সঙ্গে বিরূপ আচরণ না করে প্রকৃতিকে আপন মহিমাময় চলার ব্যবস্থা করে দিতে। যাতে আগামীর বিশ্ব বাসযোগ্য ও নিরাপদ হয়।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ,
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া