যে জিপিএ মেধাকে মাপে না

বাংলাদেশ প্রায়ই মেধা পাচার ঠেকানো এবং বিদেশে শিক্ষিত নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে আনার কথা বলে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কঠোর শিক্ষক-যোগ্যতার নিয়ম অনেক ক্ষেত্রে সেই লক্ষ্যকেই ব্যর্থ করে দিতে পারে। বিদেশের নামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা নেওয়া একজন যোগ্য বাংলাদেশি নাগরিক তার নিজের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার জন্য বিবেচিত হওয়ার আগেই বাদ পড়ে যেতে পারেন।

বর্তমানে শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা নির্ধারণে একজন প্রার্থীর শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন স্তরে-এসএসসি বা সমমান, এইচএসসি বা সমমান, স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে নির্দিষ্ট ন্যূনতম ফলাফল থাকা আবশ্যক। প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে পদ্ধতিটি সহজ হলেও একাডেমিক বিচারে এটি দুর্বল। কারণ, জিপিএ কোনো সর্বজনীন মাপকাঠি নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩.৫ সিজিপিএকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩.৫ সিজিপিএর সমতুল্য ধরে নেওয়া যায় না। প্রতিষ্ঠানভেদে পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন-পদ্ধতি, একাডেমিক কঠোরতা, গ্রেড দেওয়ার সংস্কৃতি এবং শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতার মানে বড় পার্থক্য থাকে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই ধরা যাক। সেখানে সাধারণত আমেরিকান পদ্ধতির জিপিএ দেওয়া হয় না। দেওয়া হয় ডিগ্রির শ্রেণিবিন্যাস এবং বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষার ফল। ফলে অক্সফোর্ডের ফলাফলকে চার-পয়েন্ট জিপিএতে রূপান্তর করাই একটি আনুমানিক প্রক্রিয়া। এমন কঠোর শিক্ষাব্যবস্থায় কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে শীর্ষ শ্রেণির ফল অর্জন করতে পারেন খুব সীমিতসংখ্যক শিক্ষার্থী। অথচ সেই ফলকে অপেক্ষাকৃত কম কঠোর কোনো প্রতিষ্ঠানের সিজিপিএর সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা একাডেমিকভাবে কতটা যুক্তিসংগত?

একই সমস্যা রয়েছে বিষয়ভেদেও। যুক্তরাষ্ট্রে পরিমাণগত, গবেষণাগারনির্ভর ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের অনেক বিষয়ে গড় গ্রেড অন্যান্য অনেক বিষয়ের তুলনায় কম হতে পারে। ব্যবসা, অর্থনীতি, মানবিক ও সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে গ্রেড দেওয়ার ধরন আবার আলাদা। ফলে একটি নির্দিষ্ট সিজিপিএকে সর্বজনীন মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করলে কঠোরভাবে গ্রেড দেওয়া বিষয় বা প্রতিষ্ঠান থেকে আসা প্রার্থীরাই শাস্তি পান।

মেধা পাচার বাড়াচ্ছে যে নীতি: এর পরিণতি শুধু নিয়োগে বৈষম্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই নীতি বিদেশে প্রশিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত শিক্ষাবিদদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টাকেও দুর্বল করে। ধরা যাক, একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও-লেভেল ও এ-লেভেল সম্পন্ন করে বিশ্বের একটি অত্যন্ত নির্বাচিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিলেন, পরে বিদেশে উচ্চতর গবেষণা বা পিএইচডি করলেন। পরিবার, দেশপ্রেম বা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে অবদান রাখার ইচ্ছা থেকে তিনি দেশে ফিরতে চাইলেন। কিন্তু তার কৈশোরের কোনো একটি পরীক্ষার ফল যদি ইউজিসির নির্ধারিত সীমার সামান্য নিচে থাকে, তাহলে তার গবেষণা, শিক্ষকতা, প্রকাশনা বা পেশাগত সাফল্য-কিছুই বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ না-ও থাকতে পারে।

বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয় একটি চরম কিন্তু সম্ভব উদাহরণে। কোনো বাংলাদেশি ১৬ বছর বয়সে ও-লেভেল বা এইচএসসি পরীক্ষায় খারাপ করলেন। পরে হার্ভার্ডে ভর্তি হলেন এবং শেষ পর্যন্ত পিএইচডি অর্জন করলেন। বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দেওয়ার পরও কৈশোরে পাওয়া একটি ফলাফলের কারণে তিনি বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার জন্য বিবেচিত না-ও হতে পারেন। ]

স্বাভাবিকভাবেই তখন প্রার্থীর সামনে সবচেয়ে যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত হয় বিদেশেই থেকে যাওয়া। বাংলাদেশ হারায় একজন শিক্ষককে, সেই সঙ্গে হারায় তার গবেষণার অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, সহযোগিতার সুযোগ, নতুন শিক্ষাপদ্ধতি এবং পেশাগত দক্ষতা। যে বিধি শিক্ষকতার মান রক্ষার জন্য তৈরি, সেটিই শেষ পর্যন্ত মেধা পাচারের প্রাতিষ্ঠানিক কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরাও বৈষম্যের শিকার: বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও এই নীতির বড় অসামঞ্জস্য রয়েছে। ও-লেভেল, এ-লেভেল এবং আন্তর্জাতিক ব্যাকালরিয়েট বা আইবির মতো আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীরা কঠোর পরীক্ষা, বিষয়ভিত্তিক বিশেষায়ণ, গবেষণা, লিখিত কাজ ও বিভিন্ন ধরনের মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যায়। আইবি শিক্ষার্থীদের আবার কোর্সওয়ার্ক, পরীক্ষা, গবেষণাধর্মী এক্সটেন্ডেড এসে (Extended Essay) এবং অন্যান্য মূল কার্যক্রমও সম্পন্ন করতে হয়।

কিন্তু এসব যোগ্যতাকে এমন একটি এসএসসি-এইচএসসি সমতুল্য কাঠামোর মধ্যে ফেলতে হয়, যা মূলত তাদের জন্য তৈরি হয়নি। ও-লেভেল, এ-লেভেল ও আইবির বিষয়বিন্যাস, মূল্যায়নের ধাপ কিংবা গ্রেডিং-পদ্ধতি বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষাক্রমের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। এসব বৈচিত্র্যকে যান্ত্রিকভাবে একটি বাংলাদেশি জিপিএতে রূপান্তর করলে শিক্ষার্থীর শিক্ষাগত রেকর্ডের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যই হারিয়ে যায়।

বিদেশে শিক্ষিত বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরো প্রকট। যুক্তরাষ্ট্রের মতো অনেক দেশে গ্রেড ১০ বা গ্রেড ১২ শেষে বাংলাদেশের এসএসসির মতো কোনো জাতীয় পরীক্ষা নেই। অনেক শিক্ষার্থী কোনো সরকারি জাতীয় পরীক্ষায় না বসেই স্কুলের ডিপ্লোমা পেতে পারে। স্যাট (SAT) বা অ্যাক্ট (ACT) থাকলেও সেগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষা, জাতীয় স্কুল-সমাপনী পরীক্ষা নয়। ফলে একজন প্রার্থীর বৈধ ও শক্তিশালী স্কুল-রেকর্ড এবং বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকতে পারে, অথচ এসএসসি বা এইচএসসির সঙ্গে সরাসরি তুলনীয় কোনো ফল না-ও থাকতে পারে। যে শিক্ষাব্যবস্থায় এমন পরীক্ষা কখনো ছিলই না, সেই পরীক্ষার অনুপস্থিতি কেন একজন প্রার্থীর বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পথে বাধা হবে?

শিক্ষার উদ্দেশ্য বিকাশ সাধন: এই নীতির আরেকটি সমস্যা হলো, এটি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সম্ভাবনাকেও অস্বীকার করে। ১৫ বা ১৭ বছর বয়সে একজন শিক্ষার্থী অপরিপক্কতা, অসুস্থতা, পারিবারিক সংকট কিংবা অনুপযুক্ত শিক্ষাব্যবস্থার কারণে খারাপ ফল করতে পারেন। পরে তিনিই বিশ্ববিদ্যালয়ে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করতে পারেন, উচ্চতর ডিগ্রি নিতে পারেন, গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশ করতে পারেন এবং দক্ষ শিক্ষক হয়ে উঠতে পারেন। কিন্তু 'প্রতিটি স্তরে ন্যূনতম ফল' বাধ্যতামূলক হলে বহু বছর আগের একটি এসএসসি, ও-লেভেল, এইচএসসি বা এ-লেভেলের ফল তাকে স্থায়ীভাবে অযোগ্য করে দিতে পারে। পরবর্তী জীবনের কোনো অর্জন সেই তথাকথিত ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ পাবে না।

অথচ বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি জায়গা, যেখানে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা। যে ব্যবস্থা উন্নতির মূল্য বোঝে না, তা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।

ইউজিসির কাজ নিয়ন্ত্রণ, প্রার্থী বাছাই নয়: উচ্চশিক্ষার নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, ভুয়া প্রতিষ্ঠান ঠেকানো, স্বীকৃতির মান বজায় রাখা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক প্রক্রিয়াকে বিশ্বাসযোগ্য রাখা। কিন্তু যান্ত্রিক জিপিএ-সীমার মাধ্যমে কোনো যোগ্য শিক্ষাবিদকে বিশ্ববিদ্যালয় বিবেচনাই করতে পারবে না-এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ হওয়া উচিত নয়।

একজন প্রার্থীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান, বিষয়ের গ্রেডিং-পদ্ধতি, গবেষণা ও প্রকাশনা, শিক্ষকতার দক্ষতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা, সুপারিশ ও শিক্ষাজীবনে উন্নতির ধারাবাহিকতা মূল্যায়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও একাডেমিক কমিটিই বেশি উপযুক্ত। ইউজিসি মানদণ্ড ও সুপারিশ দিতে পারে, কিন্তু সেই সুপারিশ যেন প্রাতিষ্ঠানিক বিচারবোধের বিকল্প না হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশকে বিদেশি শিক্ষাগত যোগ্যতা মূল্যায়নের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য কাঠামো তৈরি করতে হবে। সেখানে প্রতিষ্ঠানের মান, বিষয়ভেদে গ্রেডিংয়ের পার্থক্য এবং ও-লেভেল, এ-লেভেল, আইবিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থার স্বাতন্ত্র্য বিবেচনায় রাখতে হবে।

ইউজিসির উচিত জিপিএ-ভিত্তিক শিক্ষক বাছাইয়ের বাধ্যতামূলক ছাঁকনি বাতিল করা। কোনো প্রার্থীকে শুধু স্কুল, স্নাতক বা স্নাতকোত্তরের একটি নির্দিষ্ট জিপিএর কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অযোগ্য ঘোষণা করা উচিত নয়। জিপিএ একজন প্রার্থীর সামগ্রিক মূল্যায়নের একটি উপাদান হতে পারে, কিন্তু সেটি যেন চূড়ান্ত দরজা বন্ধ করে দেওয়ার চাবি না হয়।

বাংলাদেশ মেধা পাচার ঠেকাতে চায়। কিন্তু সবচেয়ে যোগ্য নাগরিকদের দেশে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে একই সঙ্গে তাদের যোগ্যতার মূল্যায়নের সুযোগ না দিলে সেই আহ্বান অর্থহীন হয়ে পড়ে। শিক্ষকতার মান কেবল কাট-অফ নম্বর দিয়ে নিশ্চিত করা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় শক্তিশালী হয় জ্ঞান, গবেষণা, অর্জন, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ এবং শিক্ষকতার সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে। সুতরাং ইউজিসির কাজ হওয়া উচিত প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করা, ব্যক্তির মেধাকে জিপিএ দিয়ে ছেঁটে ফেলা নয়।

লেখক: 'ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ'-এর ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য