ফেসবুকে 'রাগী পাখি' নামের একটি পেজে সোনালি ময়না বিক্রির ভিডিও দেওয়া হইয়াছে। সেইখানে ভিডিওদাতা দাবি করিয়াছেন, বন্যপ্রাণী বিক্রি কোনো অপরাধ নহে। অথচ চলতি বৎসরের ৭ জানুয়ারি জারি হওয়া 'বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ, ২০২৬'-এ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ কোনো মাধ্যমেই বন্যপ্রাণীর বিজ্ঞাপন ও কেনাবেচা নিষিদ্ধ করা হইয়াছে।
অর্থাৎ আইন আছে, নিষেধাজ্ঞা আছে, শাস্তির বিধানও আছে। তাহার পরও ফেসবুক ও ইউটিউবে বন্যপ্রাণীর প্রকাশ্য বেচাকেনা চলিতেছে। বিষয়টি আরো ভয়াবহ এই কারণে যে, ইহা বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যক্তির কাজ নহে। বন বিভাগের নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথাবার্তার ভিত্তিতে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনে অন্তত ৫০ থেকে ৬০ জনের এই অবৈধ ব্যবসায় যুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া গিয়াছে। কয়েকটি ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলও সক্রিয়। বন্যপ্রাণীর অবৈধ বাজার কয়েক শত কোটি টাকার বলিয়া সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা। স্বল্প দাম, সহজলভ্যতা এবং শখের কারণে দেশীয় বন্যপ্রাণী কিনিবার প্রবণতা এই বাজারকে টিকাইয়া রাখিয়াছে। সবচাইতে বড় প্রশ্নটি হইল, আইন প্রয়োগের পরও একই ব্যক্তি কীভাবে আবার একই ব্যবসায় ফিরিয়া আসেন? প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে এমন এক বিক্রেতার কথাও আছে, যিনি ২০১২ সাল হইতে এই ব্যবসা করিতেছেন এবং কয়েক বার জেল খাটিয়াও পুনরায় ব্যবসায় ফিরিয়াছেন!
প্রশ্ন হইল-শাস্তি যদি অপরাধীকে থামাইতে না পারে, তাহা হইলে সেই শাস্তির কার্যকারিতা কোথায়? ২০২৫ সালের জুলাই হইতে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৩৯৬টি অভিযানে ৮ হাজার ১৫৪টি বন্যপ্রাণী জব্দ করা হইয়াছে। ইহার মধ্যে ৪ হাজার ৫০৮টি পাখি এবং ৩ হাজার ৫৫৪টি সরীসৃপ। একই সময়ে গ্রেফতার করা হইয়াছে মাত্র ছয় জনকে। দেশে ৩১ প্রজাতির প্রাণী ইতিমধ্যে হারাইয়া গিয়াছে এবং অন্তত ২১৯ প্রজাতির বন্যপ্রাণী বিপন্ন। অতএব প্রয়োজন শুধু অভিযান নহে, অপরাধের ব্যাবসায়িক কাঠামো ভাঙিয়া দেওয়া। বন বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফরমগুলির মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান বাড়াইতে হইবে। বিক্রেতার পাশাপাশি ক্রেতাকেও আইনের আওতায় আনিতে হইবে। কারণ চাহিদা থাকিলে সরবরাহ বন্ধ হয় না। বন বিভাগের কর্মকর্তাও স্বীকার করিয়াছেন, অনলাইন চক্র শনাক্ত করিবার পর্যাপ্ত সরঞ্জাম এখনো নাই এবং আন্তঃবিভাগীয় যোগাযোগ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রয়োজন।
সমস্যাটি অবশ্য কেবল বন্যপ্রাণীর বাজারেই থামিয়া নাই। সোশ্যাল মিডিয়া এখন এমন এক বাজার, যেইখানে পণ্য বিক্রি হয় স্বপ্ন, ভয় এবং মিথ্যা আশ্বাসের ভিতর দিয়া। ডায়াবেটিসের ভেষজ মহৌষধ, ব্যথা উপশমের ঔষধ, হার্ট ভালো রাখিবার ঔষধসহ নানা তথাকথিত চিকিৎসাপণ্য চটকদারি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিক্রি হইতেছে। কোনোটি হয়তো নিম্নমানের, কোনোটি ভেজাল, কোনোটি আবার এমন দাবি করে যাহার পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণই নাই। অথচ বিজ্ঞাপনের ভাষা এমন যে, রোগী চিকিৎসকের পরামর্শ ভুলিয়া বিজ্ঞাপনের কথাই বিশ্বাস করিতে পারেন। এই প্রতারণার সবচেয়ে সহজ শিকার সাধারণ মানুষ। বিশেষ করিয়া বয়স্ক মানুষ সরল বিশ্বাসে এইসকল পণ্য কিনিয়া অর্থ হারান। কখনো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বাদ দিয়া কথিত ভেষজ চিকিৎসার উপর নির্ভর করিয়া স্বাস্থ্যঝুঁকিতেও পড়েন। অথচ পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রহিয়াছে। বিএসটিআইয়ের অনুমোদন প্রয়োজন এমন পণ্য অনুমোদন ছাড়া বাজারজাত করা চলিতে পারে না। অথচ অনলাইন বাজারে বেশির ভাগ বিক্রেতা যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই পণ্য বিক্রি করিতেছেন।
ডিজিটাল বাজার অনেক তরুণ উদ্যোক্তার জন্যই আশীর্বাদ-স্বরূপ। কিন্তু তাহাতে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি এবং অসততার আশ্রয় লইলে সেই ব্যবসা সকলের জন্যই ক্ষতিকর। সুতরাং, বন্যপ্রাণী হউক কিংবা কথিত মহৌষধ, অনলাইনে বিক্রি হইতেছে বলিয়া কোনো পণ্য আইনের ঊর্ধ্বে উঠিতে পারে না। মানুষের অর্থ, স্বাস্থ্য এবং প্রকৃতি-তিনটিকেই রক্ষা করিতে হইলে সোশ্যাল মিডিয়ার এই অদৃশ্য বাজারের উপর দৃশ্যমান রাষ্ট্রীয় নজরদারি বিশেষভাবে প্রয়োজন।

