ঈদের ছুটিতে প্রিয়জনের সাথে আনন্দময় সময় কাটিয়ে রাজধানীতে ফিরে আসছেন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মজীবী মানুষেরা। কিন্তু যাওয়ার মতো ফিরে আসার সময়েও একই ধরনের বিড়ম্বনায় পড়েছেন তারা। বাস, লঞ্চ, ট্রেনে জায়গা নেই, নেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া। ট্রেনের কাউন্টারে পাওয়া যাচ্ছে না টিকিট। কালোবাজারে কয়েকগুণ বেশি দামে টিকিট কিনেও ভিড় ঠেলে ট্রেনে উঠতে হিমশিম খাচ্ছে মানুষ। ট্রেনের কামরায় উঠতে না পেরে অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছাদে চড়েই ফিরছেন কর্মস্থলে। চাকরি বলে কথা!
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধায় ঈদুল আজহা পরবর্তী ঢাকা ফেরত যাত্রীদের চাপ থাকার অজুহাতে বাস কোম্পানিগুলো বাসের ভাড়া কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। গত ৬ আগস্ট থেকে এই বর্ধিত ভাড়ায় গাইবান্ধার বাস কাউন্টারগুলোতে টিকিট বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কোনো তত্পরতা এখন পর্যন্ত চোখে পড়েনি।
এদিকে, ঢাকাগামী ট্রেনগুলোর কোনো টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না গাইবান্ধা রেল স্টেশনে। তবে কালোবাজারে অতিরিক্ত টাকা দিলেই পাওয়া যাচ্ছে ট্রেনের টিকিট।
গাইবান্ধা থেকে চেয়ারকোচগুলোতে ঢাকা যাওয়া যেতে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে। কিন্তু এখন সর্বনিম্ন ১ হাজার ৫০০ টাকার নিচে চেয়ারকোচগুলোর কোনো টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে এসি বাসগুলোর টিকিটের মূল্য ৮৫০ টাকা হলেও এখন প্রতি যাত্রীর ভাড়া ১ হাজার ৭৫০ টাকা নির্ধারণ করেছে বাস কাউন্টারগুলো। ঢাকাগামী লোকাল বাসগুলোর ৩০০-৩৫০ টাকার টিকিট এখন বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার টাকায়।
গাইবান্ধা থেকে ঢাকাগামী রংপুর ও লালমনি এক্সপ্রেস ট্রেনের সুলভ শ্রেণির ৪৫০ টাকার টিকিট গতকাল কালোবাজারে বিক্রি হয় ১ হাজার টাকায় এবং প্রথম শ্রেণির ৮৫০ টাকার টিকিট বিক্রি হয় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকায়।
ঢাকামুখী যাত্রী গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের এনামুল হক লিকসন জানান, অরিণ পরিবহনের এসি কোচ সার্ভিসের ৮৫০ টাকার টিকিট ১ হাজা ৭৫০ টাকা দিয়ে ক্রয় করে গত শনিবার রাত ১০টার বাসে ঢাকা ফিরলাম।
ঢাকাগামী আর এক যাত্রী গাইবান্ধা সদরের তালুক মন্দুয়ারের শরিফুল ইসলাম ঢাকায় পোশাক শিল্পে কাজ করেন। তিনি বলেন, আমরা নিম্ন আয়ের মানুষ, গ্রাম থেকে ঢাকায় যাই লোকাল বাসে করে মাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা ভাড়ায়। কিন্তু ঈদ উপলক্ষ্যে সেই ভাড়া এখন ১ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছে বাস মালিকরা।
অরিণ পরিবহনের গাইবান্ধা কাউন্টারের ম্যানেজার পলাশ মিয়া এসি কোচগুলোর টিকিটের দাম ১ হাজার ৭৫০ টাকা করে নেওয়ার কথা স্বীকার করেন।
রবিবার গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের লোকাল বাস কাউন্টারের ম্যানেজার মোস্তা মিয়া বলেন, বাসের মালিক ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের কিছু করার নেই। আমরা টিকিট বিক্রির কমিশন পাই মাত্র।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়ে গাইবান্ধা বিআরটিএর উপপরিচালক ময়নুল হোসেন বলেন, এসি বাসের ভাড়া এখন পর্যন্ত বিআরটিএ কর্তৃক নির্ধারণ করা হয়নি। তাই এ ক্ষেত্রে আমাদের কিছু করার নেই।
গাইবান্ধা রেল স্টেশন মাস্টার আবুল কাশেম জানান, আগামী ২৭ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকাগামী কোনো ট্রেনের টিকিট তাদের কাছে নেই।
স্বরূপকাঠি (পিরোজপুর) সংবাদদাতা জানান, শনিবার ও গতকাল রবিবার উপজেলার দক্ষিণ কৌরিখাড়া ও ছারছিনা লঞ্চঘাটে ছিল কর্মস্থলে ফেরা মানুষের উপচেপড়া ভিড়। রবিবার বিকেলে অগ্রদূত প্লাস, মর্নিংসান-৯, ফারহান-১০, টিপু -১২ ও ঈগল- ৮ নামের পাঁচটি দ্বিতল লঞ্চ ধারণ ক্ষমতার অধিক যাত্রী নিয়ে কৌরিখাড়া লঞ্চঘাট থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে গেছে। লঞ্চগুলোতে ছিল না তিল ধারনের ঠাঁই। লঞ্চে সিট না পেয়ে বিকল্প পথে ঢাকা যাওয়ার উদ্দেশ্যে বরিশালে যান অনেক যাত্রী। অপরদিকে, বাসের টিকিটও মিলছে না। যাত্রীদের অভিযোগ মানুষজনের বাড়তি চাপের সুযোগে লঞ্চ ও বাস কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন।
শেরপুর (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, বগুড়ার শেরপুরে বাস টার্মিনালগুলোতে গত দুদিন যাবত্ ঢাকাগামী মানুষের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। অনেকে বাসের সিট না পেয়ে ট্রাক ও মাইক্রোবাস ভাড়া করে যাচ্ছেন ঢাকায়। বিভিন্ন স্থানে যাত্রীদের থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। জানা গেছে, যাত্রীরা ঢাকায় যেতে ৩০০-৪০০ টাকার ভাড়ার স্থলে ৬০০-৮০০ টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছে।
শেরপুর-ঢাকা বাস কাউন্টারের ম্যানেজার শহিদুল ইসলাম বলেন, তিন থেকে চার দিন যাত্রীর চাপ বেশি থাকবে। গাড়ির ব্যবসার এটা একটা মৌসুম। তাই এই সময় অতিরিক্ত ভাড়ার অভিযোগ থাকবেই।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিয়াকত আলী সেখ বলেন, আমি এমন কোনো অভিযোগ পাইনি। যদি কেউ অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে তাহলে দোষীদের আইনের আওতায় এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
চাটমোহরে বাড়তি ভাড়াতেও নেই বাসের
টিকিট, শিডিউল বিপর্যয়ে ট্রেন
চাটমোহর (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, এখানে বাড়তি ভাড়াতেও মিলছে না বাসের টিকিট। ট্রেনে রয়েছে ৩-৭ ঘণ্টার শিডিউল বিপর্যয়, আছে উপচেপড়া ভিড়। এ অবস্থায় কর্মস্থলে ফিরে যেতে চরম সমস্যায় পড়েছেন পাবনার চাটমোহরসহ পার্শ্ববর্তী উপজেলার হাজার-হাজার কর্মজীবী নারী-পুরুষ।
ঈদের এক দিন পর থেকেই বেসরকারি চাকুরেরা কর্মস্থলে ফিরছেন। তবে গেল শুক্রবার ও শনিবার চাটমোহর রেলস্টেশনে ভিড় ছিল সবচেয়ে বেশি। সরকারি অফিস, আদালত রবিবার থেকে পুরোদমে শুরু হওয়ায় গত দুদিনে ঢাকায় ফেরার তাগিদ ছিল কর্মজীবীদের। এ অবস্থায় সড়কে যানজট আর রেলপথে শিডিউল বিপর্যয় যাত্রীদের জন্য বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করেছে। ট্রেনে এবার স্মরণকালের শিডিউল বিপর্যয় ঘটেছে বলে মন্তব্য করলেন খোদ চাটমোহরের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্টেশন মাস্টার তাওলাত হোসেন।
তিনি জানান, সবগুলো ট্রেনেই ন্যূনতম তিন ঘণ্টার শিডিউল বিপর্যয় ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি শিডিউল বিপর্যয় ঘটেছে রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনে। ট্রেনটি ৯ ঘণ্টা ৮ মিনিট দেরিতে আসছে।
এদিকে যাত্রীদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন বাস মালিকেরা। চাটমোহর থেকে ঢাকার ভাড়া ৩০০-৩৫০ টাকা। কিন্তু ঢাকাগামী যাত্রীদের কাছে থেকে আদায় করা হচ্ছে সাড়ে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা।
বাড়তি ভাড়ার বিষয়ে মুখ খুলতে নারাজ বাস কোম্পানিগুলোর স্থানীয় চেইন মাস্টারেরা। বলছেন, চাহিদার চেয়ে বাসের পরিমাণ কম হওয়ার কারণেই টিকিট পাচ্ছেন না যাত্রীরা।