কেনাকাটায় ক্যাশব্যাক নেওয়া কি জায়েজ? জেনে নিন ইসলামের সুনির্দিষ্ট বিধান

বর্তমান ডিজিটাল লেনদেনের যুগে কেনাকাটার বিল পরিশোধের পর ক্যাশব্যাক অফার পাওয়া একটি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে পণ্য কেনার পর বিক্রেতা বা ডিজিটাল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক টাকা ফেরত দেওয়ার এই প্রক্রিয়াটি ইসলামিক শরীয়তসম্মত কি না কিংবা এটি সুদের আওতায় পড়ে কি না—তা নিয়ে সাধারণ ক্রেতাদের মাঝে প্রায়ই সংশয় ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। সম্প্রতি কেনাকাটায় ক্যাশব্যাকের শরয়ী গ্রহণযোগ্যতা এবং এর ফিকহী ব্যাখ্যা নিয়ে ইসলামিক বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ সামনে এসেছে।

বিশেষজ্ঞ আলেমরা ইসলামিক ফিকহের আলোকের স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো ব্যক্তিকে ঋণ প্রদান করে চুক্তির মাধ্যমে তার থেকে অতিরিক্ত অর্থ বা কোনো পার্থিব সুবিধা গ্রহণ করাকে মূলত সুদ বলা হয়। কিন্তু কেনাকাটার ক্ষেত্রে বিক্রেতা যদি কোনো পূর্বশর্ত ছাড়া স্বেচ্ছায় ক্রেতাকে মূল্য পরিশোধের পর ক্যাশব্যাক (Cashback) কিংবা অন্য কোনো উপহার দেন, তবে তা কোনোভাবেই সুদ হিসেবে গণ্য হবে না। কারণ এখানে ক্রেতা বিক্রেতাকে কোনো ঋণ দিচ্ছেন না, বরং পণ্যের নির্ধারিত মূল্যের বিনিময়ে তিনি তাঁর কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি বুঝে নিচ্ছেন। ফলে বিক্রেতার দেওয়া এই ক্যাশব্যাক বা অফারটি মূলত একটি হাদিয়া কিংবা বিশেষ মূল্যছাড় হিসেবে ধর্তব্য হবে।

অন্যদিকে ব্যাংক, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড কিংবা বিভিন্ন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (যেমন বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদি) ব্যবহারের মাধ্যমে পাওয়া ক্যাশব্যাকের বিষয়ে সমসাময়িক ফিকহ গবেষকদের মধ্যে একাধিক মতামত থাকলেও অধিকতর শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী এটি সম্পূর্ণ বৈধ। গবেষকদের মতে, ব্যাংক বা ডিজিটাল ওয়ালেট কর্তৃপক্ষ কোনো ঋণের অতিরিক্ত মুনাফা হিসেবে গ্রাহককে এই অর্থ প্রদান করে না; বরং এটি তাদের সেবামূলক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে উৎসাহিত করার একটি বিশেষ 'মার্কেটিং কৌশল'।

অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন যে, ব্যাংকে গ্রাহকের জমা রাখা অর্থ ফিকহের দৃষ্টিতে ঋণ (করজ) হিসেবে গণ্য হওয়ায় সেই সুবাদে ক্যাশব্যাক পাওয়া সুদের আওতায় পড়ে কি না। এ বিষয়ে শরীয়তের সুস্পষ্ট সমাধান হলো, ঋণের চুক্তিতে যদি আগে থেকেই অতিরিক্ত পরিশোধের বাধ্যবাধকতা বা পূর্বশর্ত থাকে, তবেই কেবল তা সুদ হবে। কিন্তু কোনো পূর্বশর্ত ব্যতিরেকে ঋণগ্রহীতা যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেশি প্রদান করেন, তবে তা শরীয়তে নিন্দনীয় নয়; বরং এটি একটি প্রশংসনীয় ও মুস্তাহাব আমল, যাকে ফিকহের পরিভাষায় ‘হুসনে ক্বদ্বা’ (حُسْنُ الْقَضَاءِ - সুন্দরভাবে ঋণ শোধ) বলা হয়।

হাদীস শরিফে এ সংক্রান্ত বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা এসেছে। বর্ণিত রয়েছে: حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ جَوَّاسٍ الْحَنَفِيُّ أَبُو عَاصِمٍ، حَدَّثَنَا عُبَيْدُ اللَّهِ الأَشْجَعِيُّ، عَنْ سُفْيَانَ، عَنْ مُحَارِبِ بْنِ دِثَارٍ، عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ: كَانَ لِي عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم دَيْنٌ فَقَضَانِي وَزَادَنِي، وَدَخَلْتُ عَلَيْهِ الْمَسْجِدَ فَقَالَ لِي: «صَلِّ رَكْعَتَيْنِ».

অর্থ: জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে আমার কিছু পাওনা (ঋণ) ছিল। তিনি আমার সেই ঋণ পরিশোধ করলেন এবং আমাকে পাওনার চেয়ে কিছু বেশিও দিলেন। আমি মসজিদে তাঁর কাছে প্রবেশ করলে তিনি আমাকে বললেন, "তুমি দুই রাকাত সালাত আদায় করে নাও।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৭১৫; বুখারী শরীফেও এর উল্লেখ রয়েছে)।

ইসলামিক অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার মূল চুক্তিতে নির্দিষ্ট ক্যাশব্যাক পাওয়ার কোনো আইনগত শর্ত বা অধিকার গ্রাহকের থাকে না। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পুরো বছরে কোনো অফার না দিলেও গ্রাহক তা দাবি করার অধিকার রাখেন না। এছাড়া এই ক্যাশব্যাক জমা রাখা মূল আমানত বা ঋণের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না। অনেক সময় গ্রাহক তাৎক্ষণিকভাবে একাউন্টে টাকা ঢুকিয়ে পেমেন্ট সম্পন্ন করলেও ক্যাশব্যাক পেয়ে যান, যেখানে প্রতিষ্ঠানটি সেই টাকা খাটিয়ে মুনাফা অর্জনের কোনো সুযোগই পায় না। এতে স্পষ্ট হয় যে, এটি কেবল ডিজিটাল পেমেন্ট চ্যানেল ব্যবহারে উৎসাহিত করার একটি বাণিজ্যিক প্রণোদনা।

সারগ্রাহী পর্যালোচনায় বিশেষজ্ঞরা জানান, ঋণদানের সম্পর্কের বাইরে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক ও সামাজিক সম্পর্কের অংশ হিসেবে দেওয়া উপহার বা সেবামূলক সুবিধা গ্রহণ করা ইসলামে বৈধ, তাই ডিজিটাল লেনদেন বা কেনাকাটায় প্রাপ্ত প্রচলিত ক্যাশব্যাককে সুদের অন্তর্ভুক্ত মনে করার সুযোগ নেই।