দেশ গঠনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বহুমাত্রিক ভূমিকা

রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন পরস্পর গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক সংহতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য শুধু কার্যকর প্রশাসন বা অর্থনৈতিক সক্ষমতাই যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি একটি দক্ষ, পেশাদার ও জনগণমুখী সশস্ত্র বাহিনীরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বর্তমান বিশ্বে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা প্রচলিত যুদ্ধক্ষেত্রের সীমা অতিক্রম করে জাতীয় উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, মানবিক সহায়তা, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বহুমাত্রিক ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের উন্নয়ন অভিযাত্রার একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, দুর্গম অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে গৌরবোজ্জ্বল অংশগ্রহণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে অবদান, মানবিক সংকট মোকাবিলা এবং প্রযুক্তি-নির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের সামগ্রিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান সাংবিধানিক দায়িত্ব দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা। তবে স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে, এ বাহিনীর ভূমিকা প্রচলিত সামরিক দায়িত্বের গণ্ডি অতিক্রম করে জাতীয় উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে নিরাপত্তার ধারণা কেবল সীমান্ত রক্ষা বা যুদ্ধ পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, মানবিক নিরাপত্তা, খাদ্য ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, পরিবেশগত নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং দুর্যোগ মোকাবিলাও জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে; যথা—
ক) জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ : রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রধান দায়িত্ব বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ওপর ন্যস্ত। আধুনিক যুদ্ধের ধরন পরিবর্তিত হওয়ায়, বর্তমানে নিরাপত্তা হুমকি বহুমাত্রিক রূপ ধারণ করেছে। প্রচলিত সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি সীমান্ত অপরাধ, আন্তঃদেশীয় সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ, সাইবার হামলা, নাশকতা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তাও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। জাতীয় প্রয়োজনে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ দমন, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা, বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী অসামরিক প্রশাসনকে সর্বদা সহায়তা প্রদান করে আসছে। নির্বাচন, জাতীয় অনুষ্ঠান এবং বিশেষ নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও সেনাবাহিনী শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার পাশাপাশি যে কোনো উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকরিভাবে কাজ করে আসছে।

খ) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অবদান : বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। প্রতি বছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিধসের মতো দুর্যোগ, দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল হিসেবে কাজ করে। দুর্যোগপূর্ব প্রস্তুতি, উদ্ধার অভিযান, জরুরি চিকিৎসা, নিরাপদ আশ্রয় স্থাপন, ত্রাণ বিতরণ, যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমে সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। বন্যাকবলিত এলাকায় নৌযান ও প্রকৌশল সরঞ্জামের মাধ্যমে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার, অস্থায়ী সেতু নির্মাণ এবং বিচ্ছিন্ন এলাকায় খাদ্য ও ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর দক্ষতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, আম্পান, সিত্রাং এবং সাম্প্রতিক বন্যাসহ বিভিন্ন দুর্যোগে সেনাবাহিনী লক্ষাধিক মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তর, ত্রাণ বিতরণ এবং অসংখ্য চিকিৎসা ক্যাম্প পরিচালনা করেছে। এসব কার্যক্রমে সেনাবাহিনীর প্রকৌশল, চিকিৎসা ও লজিস্টিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, সেতু ও যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুত পুনরুদ্ধার এবং বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ সচল করতে সেনাবাহিনীর ইউনিটগুলো কার্যকর ভূমিকা পালন করার ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা দ্রুত পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।

গ) অবকাঠামো উন্নয়নে অবদান : একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো উন্নত অবকাঠামো। দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, জরুরি সড়ক নির্মাণ, অস্থায়ী ও স্থায়ী সেতু নির্মাণ, নদী পারাপারের ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন কৌশলগত অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গৃহীত এসব প্রকল্পে সেনাবাহিনী প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, প্রকৌশল সহায়তা, নিরাপত্তা প্রদান, ভূমি উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা নির্মাণ, মান নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তঃসংস্থা সমন্বয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছে। বিশেষ করে কৌশলগত ও জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন প্রকল্পসমূহে সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব, দক্ষ প্রকৌশল সক্ষমতা এবং সময়মতো কাজ সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা প্রকল্প বাস্তবায়নে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে জাতীয় অর্থনীতির মূলধারার সঙ্গে আরো কার্যকরভাবে সংযুক্ত করতে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পে প্রয়োজনীয় প্রকৌশল ও নিরাপত্তা সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। একইভাবে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়নের অন্যতম বৃহৎ উদ্যোগ ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প, ফ্লাইওভার এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণকাজে নিরাপত্তা ও সমন্বয়মূলক দায়িত্ব পালন করা হয়েছে। কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর উন্নয়নের মতো কৌশলগত প্রকল্পগুলোতেও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত সহায়তা প্রদান করা হয়েছে, যা এসব প্রকল্পের নির্বিঘ্ন বাস্তবায়নে সহায়ক হয়েছে। চট্টগ্রামসহ দুর্গম এলাকায় সড়ক নির্মাণ, সেতু স্থাপন এবং যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও প্রসার ঘটেছে।

ঘ) জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অবদান : জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ দেশের পররাষ্ট্রনীতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জাতীয় মর্যাদা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব ও মানবিক দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের জন্য বিশেষ সুনাম অর্জন করেছেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীরা সংঘাত- পরবর্তী শান্তি প্রতিষ্ঠা, বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অস্ত্রবিরতি পর্যবেক্ষণ, মানবিক সহায়তা প্রদান, নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা, অবকাঠামো পুনর্গঠন এবং স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে দায়িত্ব পালন করে বহু বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী আত্মত্যাগ করেছেন, যা দেশের জন্য গৌরবের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা আরো বৃদ্ধি করেছে। এছাড়াও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা, বহুজাতিক পরিবেশে কাজ করার দক্ষতা এবং নেতৃত্বের সক্ষমতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। দেশে ফিরে এই অভিজ্ঞতা সেনাবাহিনীর পেশাগত দক্ষতা ও আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সার্বিকভাবে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ কেবল আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখেনি; বরং বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি, কূটনৈতিক অবস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং সেনাবাহিনীর পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশ গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

ঙ) স্বাস্থ্যসেবায় অবদান : বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের স্বাস্থ্য খাতে একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্বাস্থ্যসেবার মূল ভিত্তি হলো সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল নেটওয়ার্ক। দেশের বিভিন্ন সেনানিবাসে প্রতিষ্ঠিত এসব আধুনিক হাসপাতাল বিশেষায়িত চিকিৎসা, জরুরি সেবা, অস্ত্রোপচার, নিবিড় পরিচর্যা, পুনর্বাসন এবং উন্নত রোগ নির্ণয় সুবিধা প্রদান করে। আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি, দক্ষ চিকিৎসক এবং সুসংগঠিত ব্যবস্থাপনার কারণে অনেক ক্ষেত্রে বেসামরিক জনগণও এসব হাসপাতালের সেবা গ্রহণের সুযোগ পেয়ে থাকে। জাতীয় দুর্যোগ, মহামারি ও মানবিক সংকটের সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিকিৎসা ইউনিট ও ফিল্ড হাসপাতাল দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়মিত মেডিক্যাল ক্যাম্প, বিনা মূল্যে চিকিৎসা, ওষুধ বিতরণ এবং স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিচ্ছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন এবং দুর্যোগ-পরবর্তী মানবিক সহায়তা কার্যক্রমেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দক্ষতার সঙ্গে চিকিৎসাসেবা প্রদান করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সুনাম বৃদ্ধি করেছে।

চ) শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান : শিক্ষা একটি জাতির উন্নয়নের মৌলিক ভিত্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের প্রধান মাধ্যম। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষা বিস্তার ও মানবসম্পদ উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সেনাবাহিনী পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা, আধুনিক অবকাঠামো, দক্ষ শিক্ষক, সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের আনুগত্য, নেতৃত্ব ও নৈতিকতার বিকাশে অনন্য অবদান রাখছে। বর্তমানে ১২টি ক্যাডেট কলেজ, ৪৪টি ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ, ১৯টি সেনাবাহিনী পরিচালিত ইংরেজি মাধ্যম/ভার্শন প্রতিষ্ঠান এবং ৩৯টি ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড স্কুল ও কলেজের মাধ্যমে সামরিক ও বেসামরিক উভয় পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (BUP), মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (MIST), আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং আর্মি ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনসমূহ প্রকৌশল, ব্যবসায় শিক্ষা, গবেষণা ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। একইভাবে আর্মড ফোর্সেস মেডিক্যাল কলেজ, আর্মি মেডিক্যাল কলেজসমূহ এবং নার্সিং কলেজগুলো দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য দক্ষ চিকিৎসক ও নার্স তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদান উল্লেখযোগ্য। ‘প্রয়াস’ বিশেষায়িত বিদ্যালয়সমূহ অটিজম ও অন্যান্য বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা, পুনর্বাসন ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের সমাজের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে কাজ করছে। পাশাপাশি নারী শিক্ষা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং নিরাপদ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে সেনাবাহিনী একটি দক্ষ, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজ গঠনে কার্যকর ভূমিকা রেখে চলেছে। ফলে শিক্ষা খাতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদান কেবল শিক্ষার প্রসারেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জাতি গঠনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

ছ) অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান : একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে ওঠে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা, কার্যকর অবকাঠামো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের ওপর। নিরাপত্তাহীনতা, সন্ত্রাসবাদ, নাশকতা বা দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের জন্য বহু প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। এ কারণে আধুনিক রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে
পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করে জাতীয় অর্থনীতির বিকাশে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চল, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ( Economic Zones ), সমুদ্রবন্দর, স্থলবন্দর, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্যাসক্ষেত্র এবং অন্যান্য কৌশলগত অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা প্রদান করে। জাতীয় জরুরি পরিস্থিতি, দুর্যোগ বা নিরাপত্তাজনিত সংকটে সেনাবাহিনীর দ্রুত মোতায়েন ও কার্যকর সমন্বয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়ক হয়। এর ফলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি পায়, শিল্প উৎপাদন অব্যাহত থাকে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

জ) জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় ভূমিকা : জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য একটি অন্যতম প্রধান নিরাপত্তা ও উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ। ভৌগোলিক অবস্থান এবং জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যের কারণে বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় ক্ষয়ের মতো দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব দুর্যোগ শুধু মানুষের জীবন ও সম্পদের ক্ষতি করে না; বরং কৃষি, অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা, দুর্গত জনগণকে নিরাপদ আশ্রমে স্থানান্তর, জরুরি চিকিৎসাসেবা ও ত্রাণ বিতরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, সেতু ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে মানবিক সহায়তা প্রদান করে। নদীভাঙন ও উপকূলীয় এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের পুনর্বাসন, জরুরি অবকাঠামো নির্মাণ এবং বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহেও সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি নিয়মিত দুর্যোগ প্রস্তুতি মহড়া, আন্তঃসংস্থা সমন্বয় এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং একটি দুর্যোগ-সহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।

উপসংহার : বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজ শুধু একটি প্রতিরক্ষা বাহিনী নয়, এটি জাতীয় উন্নয়ন, মানবিক সহায়তা এবং রাষ্ট্র গঠনের একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার। স্বাধীনতার পর থেকে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সহায়তা, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা এবং মানবিক সংকটে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাহিনী দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। দেশ গঠনের দীর্ঘমেয়াদি অভিযাত্রায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই বহুমাত্রিক অবদান একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে সহায়ক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হবে।

লেখক : সেনা কর্মকর্তা