মানবতার মুক্তির দূত মহানবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম । তিনি রাহমাতুল্লিল আলামিন বা সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ। তাহার জন্ম ও ওফাতের স্মৃতিবিজড়িত দিন আরবি তৃতীয় মাস রবিউল আউয়ালের ১২ তারিখ। আজ সেই মহিমান্বিত ও পবিত্র দিন। তাই বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর নিকট এই দিনটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ।
রবিউল আউয়াল মাসের এই দিনে আরবের আইয়্যামে জাহেলিয়াত বা অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগে হেদায়েতের আলোকবর্তিকা লইয়া সত্য ও সুন্দরের প্রতীকরূপে আবির্ভূত হন বিশ্বনবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম । তৎকালীন সমাজ যখন অন্যায়, অত্যাচার, পৌত্তলিকতা, নৈতিক অবক্ষয়, অমানবিকতা ইত্যাদিতে নিমজ্জিত ছিল, ঠিক সেই কঠিন সময়ে তিনি সমগ্র মানবজাতির জন্য করুণার আধার হিসাবে প্রেরিত হন । এই জন্য ঈদে মিলাদুন্নবি কেবল উৎসব বা আনন্দের দিন নহে, ইহা আত্ম-উপলব্ধি, ইমানি চেতনা পুনরুজ্জীবিতকরণ এবং প্রিয় নবির সুমহান আদর্শকে জীবনে ধারণ করিবার এক মহান সুযোগ। বিশ্বনবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও মানবকল্যাণের বাণী প্রচার করিয়া গিয়াছেন, তাহা আজিকার সংঘাতময় ও অস্থির পৃথিবীতে আরও অধিক প্রাসঙ্গিক ও অপরিহার্য হইয়া উঠিয়াছে । তিনি কেবল একজন ধর্মীয় নেতা ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক, সমাজসংস্কারক ও ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্রনায়ক। মদিনা সনদের মাধ্যমে তিনি সমাজে অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মানবাধিকারের স্বীকৃতি এবং শান্তিময় সহাবস্থানের যেই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন, তাহা আধুনিক বিশ্বব্যবস্থার জন্যও এক অনুপম আদর্শ।
উল্লেখ্য, ঈদে মিলাদুন্নবিতে বর্তমানে মিলাদ-কিয়ামের প্রচলন রহিয়াছে। ৬০৪ হিজরিতে আবু সাঈদ মুজাফফর উদ্দিন কুফরি ইরাকের মুসিল শহরে সর্বপ্রথম ইহার প্রচলন করেন বলিয়া জানা যায়। ইহা লইয়া বিতর্ক থাকিলেও প্রতি বৎসর আমাদের দেশে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবি উপলক্ষ্যে মাদ্রাসা-মসজিদগুলিতে কিরাত, হামদ, নাত, গজল, আজান, ইসলামি রচনা ইত্যাদি যে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়, তাহা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় । এই উপলক্ষ্যে আলোকসজ্জা করা কিংবা বিদআতপূর্ণ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যথাসম্ভব পরিহার করাই বাঞ্ছনীয় । বরং আজিকার এই দিনে আমাদের গভীরভাবে আত্মপর্যালোচনা করিতে হইবে—আমরা কি প্রকৃতপক্ষে মহানবির শিক্ষা অনুসরণ করিতেছি? তাহার সিরাত বা জীবনচরিত ও বাণীসমূহ অনুসরণ করিতেছি? তাহা না করিয়া কেবল বাহ্যিক অনুষ্ঠান পালনে ঈদে মিলাদুন্নবির প্রকৃত সাফল্য অর্জিত হইতে পারে না । আজিকার এই দিনে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর প্রধান দায়িত্ব হইল নিজ নিজ জীবনে ও সমাজে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মহান আদর্শকে বাস্তবে রূপদান করা। ব্যক্তিগত চরিত্র গঠন হইতে শুরু করিয়া সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে হিংসা-বিদ্বেষ পরিহারপূর্বক পরমতসহিষ্ণুতা, শান্তি ও সাম্যের বার্তা ছড়াইয়া দেওয়া। এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—আমরা তাহার নির্দেশিত আলোর পথে চলিব। সর্বপ্রকার অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও পথভ্রষ্টতা পরিহার করিব।
প্রকৃতপক্ষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের প্রতিটি ক্ষণ ছিল মানবতার কল্যাণে উৎসর্গীকৃত । তিনি শিখাইয়াছেন কীভাবে মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শন করিতে হয়, কীভাবে প্রতিবেশীর হক আদায় করিতে হয় এবং কীভাবে একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠন করা যায় । আজিকার এই অস্থির ও কোলাহলপূর্ণ বিশ্বে যখন চারিদিকে যুদ্ধবিগ্রহ, অশান্তি, হিংসা ও নৈতিক অবক্ষয় বিরাজমান, তখন প্রিয় নবির এই সকল আদর্শ অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। তাহার ক্ষমাশীলতা, সততা, ওয়াদা রক্ষা করিবার গুণ ও পরমতসহিষ্ণুতা আজ আমাদের জাতীয় ও ব্যক্তিগত জীবনে প্রতিষ্ঠিত হইতেছে কি না, তাহা আজ আত্মবিশ্লেষণ করা সময়ের দাবি। কেননা প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রদর্শিত পথেই নিহিত রহিয়াছে মানবজাতির প্রকৃত শান্তি ও মুক্তি । আল্লাহ তাআলা সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে হুজুরে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ সঠিকভাবে অনুধাবন ও পালনের তৌফিক দান করুন এবং বিশ্ব জুড়িয়া শান্তি ও সমৃদ্ধি বর্ষণ করুন। আমিন ।