রাতের ঢাকা শহর এখন সাধারণ মানুষের জন্য ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে। সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়গুলোতে পুলিশের স্থায়ী চেকপোস্টের দেখা মিলছে না। নিয়মিত মোবাইল টহল বা টহল দলগুলোর নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে ফাঁকা হয়ে পড়া রাস্তাগুলোতে অপরাধ বাড়ছে। ফলে গভীর রাতে যাতায়াতকারী চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ পথচারীদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ছিনতাইয়ের আতঙ্ক বিরাজ করছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে বর্তমানে ৩৪২টি ছিনতাইয়ের ‘হটস্পট’ বা অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। হটস্পটের শীর্ষে মোহাম্মদপুর ও উত্তরা। সম্প্র্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, একসময় যেসব এলাকায় গভীর রাতেও পুলিশের একাধিক টিম ও তল্লাশি চৌকি সচল থাকত, বর্তমানে তার অধিকাংশ চেকপোস্টই ফাঁকা পড়ে রয়েছে। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও প্রায়ই সেনাবাহিনী চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করত। এখন কোনো ধরনের চেকপোস্টই বসছে না।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় সবচেয়ে বেশি ১০৮টি ছিনতাইয়ের হটস্পট রয়েছে। এই এলাকায় ২৪০ জন তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে। উত্তরা ও গুলশান এলাকায় ৯৪টি ছিনতাইয়ের হটস্পট চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে উত্তরা পশ্চিম ও এয়ারপোর্ট রোড অপরাধীদের অন্যতম প্রধান রুট।
মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ, বসিলা, ঢাকা উদ্যান এবং শেখেরটেক এলাকায় ‘টানা পার্টি’ এবং কিশোর গ্যাংয়ের উত্পাত রয়েছে। সম্প্রতি শেখেরটেকে বিকাশ এজেন্টের ওপর হামলা, ডেল্টা ব্যুরো ডি চেঞ্জের ম্যানেজারের কাছ থেকে অস্ত্রের মুখে ৫০ লাখ টাকা ছিনতাই এবং পুলিশের ওপর হামলার মতো ঘটনা ঘটেছে। এমনকি থানা থেকে মাত্র তিন মিনিটের দূরত্বে অস্ত্রের মুখে ছিনতাইয়ের শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
উত্তরার বিভিন্ন সেক্টরের ভেতরের সুনসান রাস্তা এবং এয়ারপোর্ট রোডের নির্জন এলাকাগুলোতে মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারী চক্র সক্রিয়। গভীর রাতে রিকশা বা সিএনজি থামিয়ে কিংবা চলন্ত গাড়ি থেকে ব্যাগ ও মোবাইল টেনে নেওয়ার ঘটনা এখানে নিত্যদিনের চিত্র। অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সম্প্রতি র্যাব-২ এবং ঢাকা মহানগর পুলিশ বিশেষ অভিযান শুরু করেছে। গতকাল সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডিএমপির উত্তরা পশ্চিম, মোহাম্মদপুর এবং হাজারীবাগ থানা এলাকা থেকে ছিনতাই, মাদক ব্যবসা ও ডাকাতির অভিযোগে ৭৬ জন অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকা থেকে ৩০ জন এবং মোহাম্মদপুর থেকে ৩১ জন সক্রিয় অপরাধীকে অস্ত্র ও মাদকসহ আটক করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই অভিযানগুলো সাময়িক স্বস্তি দিলেও রাতে স্থায়ী চেকপোস্ট ও নিয়মিত পুলিশি টহল নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ফিরবে না। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্র্রতিক সময়ে মাঠপর্যায়ে পুলিশের তীব্র জনবল সংকট এবং দায়িত্ব পালনে আস্থার অভাব এই পরিস্থিতির জন্য প্রধানত দায়ী। অনেক থানায় পর্যাপ্ত গাড়ি এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া, পুলিশ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে চলমান সংস্কার কার্যক্রমের কারণেও মাঠপর্যায়ের নিয়মিত কার্যক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা বা শিথিলতা কাজ করছে। নিরাপত্তার এই ঘাটতি নিয়ে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে একাধিক কর্মকর্তা জানান, ঢাকা শহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ও ডিএমপি যৌথ বাহিনীর সহায়তায় নিয়মিত কাজ করছে। সাধারণ সড়কগুলোতে জনবল সংকটের কারণে সার্বক্ষণিক চেকপোস্ট ধরে রাখা কঠিন হলেও অনেক এলাকায় চেকপোস্ট কাজ করছে।
রাজধানীর বিজয় সরণি, তেজগাঁও, মহাখালী, বনানী, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও কারওয়ান বাজারসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা মধ্যরাতের পর ঘুরে দেখা গেছে এক ভিন্ন চিত্র। একসময় এসব এলাকায় গভীর রাতেও পুলিশের একাধিক টিম ও তল্লাশি চৌকি সচল থাকত। তবে বর্তমানে অধিকাংশ চেকপোস্টই ফাঁকা পড়ে রয়েছে। কিছু জায়গায় পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেলেও সেখানে কোনো পুলিশ সদস্যের সক্রিয় উপস্থিতি বা নজরদারি চোখে পড়ে না। ব্যবসায়ী ও গভীর রাতের পথচারীদের অভিযোগ, মধ্যরাতের পর থেকে ভোর পর্যন্ত রাজধানীর সড়কগুলোতে আইনশৃঙ্খলবাহিনীর নজরদারিহীন রয়েছে। এই সুযোগে শহরের বিভিন্ন স্পটে সশস্ত্র ছিনতাইকারী ও ‘টানা পার্টি’র উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
কারওয়ান বাজারের এক কাঁচামাল ব্যবসায়ী জানান, আমরা রাত ২টা-৩টার দিকে যখন আমরা মালামাল নিয়ে যাই, তখন রাস্তায় কোনো পুলিশ থাকে না। সম্পূর্ণ নিজেদের ঝুঁকিতে চলাচল করতে হয়। যে কোনো সময় ছিনতাইয়ের শিকার হওয়ার ভয়ে থাকতে হয়। কূটনৈতিক জোন এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে চেকপোস্ট ও নজরদারি বাড়ানো হলেও সাধারণ সড়কগুলোতে জনবল সংকটের কারণে সার্বক্ষণিক চেকপোস্ট ধরে রাখা কঠিন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।