নেপালে ফের বড় বন্যার শঙ্কা, উজানে জলপ্রবাহে বাধা এখনো ভাঙেনি

নেপালের রাসুয়া জেলায় বুধবার হঠাৎ ভয়াবহ বন্যা হওয়ার পর এখন নতুন করে আরও বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে উজানে এখনো জলপ্রবাহে একটা বাধা রয়ে গেছে। সেটা ভেঙে গেলে আবারও শক্তিশালী ঢেউ এসে বন্যা সৃষ্টি করতে পারে।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন সংস্থা আইসিআইএমওডি এই সতর্কবার্তা দিয়েছে। সংস্থাটি হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের আটটি দেশ—ভারত, নেপাল, ভুটান, চীন, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও আফগানিস্তান নিয়ে কাজ করে।

আইসিআইএমওডির তথ্য অনুযায়ী, ২৬ আগস্ট স্থানীয় সময় সকাল ৯টার দিকে ভোতে কোশি অববাহিকায় হঠাৎ পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়তে শুরু করে। এরপর ভোতে কোশি নদী দিয়ে তীব্র স্রোত ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থার দিকে নেমে যায়। পানির সঙ্গে প্রচুর পলি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষও ভেসে যায়।

পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ ছিল, তা নদীর পানি বৃদ্ধির মাত্রা থেকেই বোঝা যায়। গালচিতে ত্রিশূলী নদীর পানি মাত্র ৩০ মিনিটে প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায়। একই সময়ে মালেখুতে পানির উচ্চতা প্রায় ৭ মিটার বৃদ্ধি পায়। বিজ্ঞানীদের মতে, এত দ্রুত পানি বাড়া মানে উজান থেকে বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ একসঙ্গে নেমে এসেছে।

বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, উঁচু পাহাড়ি এলাকায় বড় ধরনের বরফ ও পাথরের ধস থেকে এই বিপর্যয়ের শুরু হতে পারে। প্রাথমিক ভিডিও ও ঘটনাস্থলের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথরের ধ্বংসাবশেষ লহেন্দে খোলায় পড়ে থাকতে পারে। এতে নদীর পানি হঠাৎ সরে গিয়ে শক্তিশালী ঢেউ তৈরি হয়ে ভাটির দিকে ছুটে যেতে পারে।

আরেকটি সম্ভাবনা হলো সাময়িক ভূমিধসের বাঁধ তৈরি হওয়া। ধ্বংসাবশেষ নদীর সংকীর্ণ অংশ আটকে দিলে সেখানে প্রচুর পানি জমে প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হতে পারে। পরে সেই বাঁধ ভেঙে গেলে আরও শক্তিশালী দ্বিতীয় দফার বন্যা হতে পারে।

আইসিআইএমওডির জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাং বলেছেন, গত বছরের রাসুয়া বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত একই এলাকা আবারও হুমকির মুখে পড়েছে। লহেন্দে খোলায় বরফধসকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হলেও বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়। উজানে নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে বাধা রয়ে যাওয়ায় দ্বিতীয় দফায় বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে জিলং বন্দরের আশপাশের এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ জারি করা হয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। রাসুয়া ছাড়াও নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলায় ভাটির দিকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, বন্যায় অবকাঠামো ও পানি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদী উপত্যকার বসতিগুলোও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

দুর্ঘটনার সময় অস্বাভাবিক ভূকম্পন সংক্রান্ত সংকেতও শনাক্ত হয়েছে। জিলংয়ের একটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্র ও ঝাংমুর আরেকটি কেন্দ্রে এসব সংকেত ধরা পড়ে। তবে এই সংকেতের সঙ্গে বন্যার সরাসরি সম্পর্ক এখনো নিশ্চিত হয়নি।

আইসিআইএমওডির দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিশেষজ্ঞ শশ্বত সান্যাল বলেছেন, লহেন্দে খোলা ১৪ মাসের মধ্যে দুবার বন্যার কবলে পড়েছে। এবার সম্ভবত বরফধস নদী আটকে দিয়ে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি করেছে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

সংস্থাটির হিমবাহ ও তুষারাঞ্চল বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফারুক আজম বলেছেন, হিমালয় অঞ্চলে বরফ, হিমবাহ ও তুষারভূমি সংক্রান্ত ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। সীমান্ত অতিক্রম করে এসব দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশগুলোর মধ্যে আরও সমন্বিত সহযোগিতা দরকার।

আইসিআইএমওডির মহাপরিচালক পেমা গিয়ামতশো নেপালের এই দুর্যোগে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও নেপাল সরকারের প্রতি সংহতি জানিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ, তুষার, পারমাফ্রস্ট ও পাহাড়ি ঢালের পরিস্থিতিতে পরিবর্তন ঘটছে। তবে এই নির্দিষ্ট বন্যায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঠিক কতটা ভূমিকা ছিল, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

উজানে তৈরি হওয়া কৃত্রিম বাধার স্থায়িত্ব পরীক্ষা করাই এখন বিজ্ঞানীদের মূল অগ্রাধিকার। কৃত্রিম উপগ্রহের চিত্র, জলপ্রবাহ ও ভূকম্পনের নানা উপাত্ত বিশ্লেষণের কাজ চলায় ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের ওপর থেকে দুর্যোগের ঝুঁকি এখনও পুরোপুরি সরেনি।

সূত্র: এনডিটিভি